আলাস্কায় ফেয়ারব্যাঙ্কস বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ মাথা পাগল বাংলাদেশী

প্রচলিত আছে, বিদ্যা অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও। তাই কেউ চায়নায় পড়তে গেছে শুনে আমি অবাক হই নাই কখনো। কিন্তু বিদ্যা অর্জনের জন্য কেউ চীন-টিনকে গুল্লি মেরে বাংলাদেশ থেকে আলাস্কায় চলে আসবে আমার একদম বিশ্বাসই হচ্ছিল না। ফিনল্যান্ড প্রবাসী বন্ধু রনি মারফত এদের খোঁজ পাওয়ার পর মনে হলো এদের সাথে দেখা করে ব্যাপারটা সত্যি কিনা বোঝা দরকার। আর যদি সত্যিই হয় তাহলে এদের মাথা ঠিক আছে কিনা সেটাও একটু পরীক্ষা করে দেখা দরকার। গরমে মানুষের মাথা খারাপ হতে পারলে অতিরিক্ত ঠান্ডাতেও তো হতে পারে। মাথা খারাপ ছাড়া এই মাইনাস ৪০/৪৫ ডিগ্রির দেশে পড়তে আসা এবং তারপর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

University-of-Alaska-Fairbanks-2

শীতকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে সাদা সাদা আরও সাদা! ছবি: সংগৃহীত

আলাস্কায় আমি আর দিয়া ঘাটি গেড়েছি এক ইউএস মিলিটারির বাসায়। পদমর্যাদায় সে ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন জে. কোলিয়ার। আমরা ডাকি জেসি। সাথে আছে এক তাইওয়ানিজ মেয়ে। বিশাল এক ফোর হুইলার এসইউভি নিয়ে আমরা আগাগোড়া বরফে মোড়া এই রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি গত কয়েকদিন। ডগ স্লেজিং করছি, ডেনালি মাউন্টেন রেঞ্জ যাচ্ছি, চেনা হট স্প্রিংয়ে ঝাপিয়ে পড়ছি, গ্লেসিয়ার দেখে মুগ্ধ হচ্ছি, বরফে মোড়া নদীতে আইস ফিশিং করছি, আইস হকি দেখছি, স্নো মোবিলে করে বরফের উপর দিয়ে তুরন্ত গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছি, মাইনাস পনেরো ডিগ্রির হিম শীতল বাতাসে দাড়িয়ে অরোরা দেখে বিস্ময়ে মুগ্ধ হচ্ছি। কিন্তু সেসব মুগ্ধতা ছাড়িয়ে গেল এই সুদূর আলাস্কায় এই ছেলেগুলোকে দেখে।

//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

ডেনালি মাউন্টেন রেঞ্জ থেকে ফেরার পথে ফোন দিলাম এদের একজনকে। রাত তখন নয়টা। চারদিকে সুন্দর সূর্যের আলো (এই সিজনে রাত হয় দশটায়)। বললাম, আমরা আসতেছি। ডেনালিতে একটা দেড় ঘন্টার হাইকিংয়ে গিয়ে আমাদের হাড্ডি পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে। গাড়ির হিটারও সেটা গরম করতে পারছে না। তোমরা হিটার চালায়া ঘর গরম কর।

17626357_10154464210850318_8988305647396247504_n

খাওয়ার পর তোলা ম্যান্ডেটরি সেলফি!

পৌঁছে দেখি ঘর খালি গরমই করে নাই, চিংড়ি বিরিয়ানীর মৌ মৌ গন্ধ ছড়ানোরও ব্যবস্থা করেছে তারা। দীর্ঘদিন ভাত না খাওয়া আমি আর দিয়া মোটামুটি ঝাপিয়ে পড়লাম সেটার উপর। খেতে খেতেই গল্প হলো তাদের সাথে। এই মুহূর্তে ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা, ফেয়ারব্যাঙ্কসে বাংলাদেশী ছাত্র আছে মোটমাট এই পাঁচজন। তবে পথিকৃত (ছবিতে) সর্বডানের জন আর সর্ববামের জন। দুইজনই আন্ডারগ্রাড করেছে সিলেটের শাহজালালে। এখন তারা এখানে মাস্টার্স করছে পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং বিষয়ে। বাকি তিনজনের একজন রুয়েট থেকে ইলেকট্রিকালে পড়ে এখন পড়ছে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে, একজন চুয়েট থেকে মেকালিক্যাল পড়ে এখানেও মেকানিক্যাল আর আরেকজন এআইইউবি থেকে ইলেকট্রিক্যাল পড়ে এখানেও ইলেকট্রিক্যালেই। দুনিয়ার গল্প করতে করতে কখন সন্ধ্যা ১২টা বেজে গেল টেরই পেলাম না। তবে এর মাঝে আমি আমার উত্তর ঠিকই পেয়ে গেছি। এদের মাথা আসলেই ঠিক নাই। কীভাবে বুঝলাম, একটা উদাহরণ দেই।

ফেয়ারব্যাঙ্কস ইউনিভার্সিটির সামনে একটা বড় নিয়ন বোর্ড আছে তাপমাত্রা নির্দেশক। সেটায় এই মুহূর্তের তাপমাত্রা কত সেটা দেখায়। একদিন মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এদের একজন গাড়ি থেকে খালি গায়ে নেমে দুই মিনিট দৌড়ে সেই নিয়ন বোর্ডের সামনে দাড়িয়ে ছবি তুলে আবার দৌড়ে গাড়িতে এসেছে। এরপর সে আক্ষরিক অর্থে মরতে বসেছিল। গরম জলে ডুবিয়ে কোন রকমে সেবার রক্ষা। পাগল না হলে কেউ এমন করে নাকি! (যাদের আলাস্কার মাইনাস ৪০ নিয়ে কোন ধারণা নাই তাদের একটু বলি, এক রাতে আমি মাইনাস আঠারোতে হাতের মোটা গ্লাভস খুলে ক্যামেরার ট্রাইপড ঠিক করছিলাম ১০ সেকেন্ড। গুড়া মরিচে অনেকক্ষণ হাতালে হাত যেমন জ্বলে আমার হাত সারা রাত সেরকম জ্বলেছে। আরেক হাতের কয়েকটা আঙ্গুলে সাড়া পাইনি বেশ কিছুক্ষণ।)

tumblr_n7umxztGqf1qlf8pco2_1280

ক্যাম্পাসে তাপমাত্র নির্দেশক বোর্ডের সামনে মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আরও একদল মাথা পাগল ছাত্র! ছবি: সংগৃহীত

আসার সময় তাদের বললাম, তোমার অনেক ভালো ছেলে। বাঁচতে চাইলে দ্রুত ক্রেডিট ট্রান্সফার করে অন্য কোনো গরম স্টেটে যাও আর না হয় মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফিরে গিয়ে ঢাকার গরমে জ্যামে বসে থাকতে থাকতে সরকারকে গালিগালাজ কর। গরমের দেশের মানুষ আমরা, এই রকম ঠান্ডায় এসে মরার কোন মানে হয় না। এ শুনে একজন দাঁত বের হেসে বলল, কি যে বলেন ভাইয়া, আমরা আরও দল ভারি করতেছি। আমি অ্যাডমিশন অফিসে কাজ করি পার্ট টাইম, আমরা জুনিয়রদের মাঝে এই ইউনির খবর ছড়ায়া দিয়েছি। এইবার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৩০ জনের মতো অ্যাপ্লাই করেছে। তার মধ্যে ১০-১২ জন তো টিকবেই, ইনশাল্লাহ। এরপর আমরা বাংলাদেশ সমিতি বানাবো এখানে। এরপর নির্বাচন করবো। সভাপতি-সেক্রেটারি পদ নিয়ে মারামারি করবো। হাহাহাহা।

আমি আর কী বলবো এদের! এরপর কেউ আলাস্কার ফেয়ারব্যাঙ্কস শহরে এলে একটু দেখা করে যাবেন এদের সাথে। মাথা খারাপ বাড়লো না কমলো এইটা লক্ষ্য রাখা দরকার।

UAF cheerleaders pose in front of the SRC on the Fairbanks campus.

তবে গ্রীষ্মকালে এই বিশ্ববিদ্যালয় সাদার খোলস ভেঙ্গে হয়ে উঠে সবুজ! ছবি: সংগৃহীত

আপডেট: এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর নুসরাত তন্বী নামে একজন আমাকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠিয়েছেন। সংক্ষেপে সেইটা এ রকম–হ্যালো ভাইয়া, আপনি রিসেন্টলি ফেয়ারব্যাঙ্কসে এসেছিলেন শুনলাম। আমি আর আমার হাজব্যন্ড এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসিই ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্স করছি। আপনার পোস্ট দেখে আমার আত্মীয় স্বজন অনেকেই জানতে চাইছেন আমরা সত্যিই এখানে পড়ি কিনা, হাহাহা। আপনি আমাদের বেশ ভেজালে ফেলে দিয়েছেন। …আমরা এখানে মোট ১৪ জন আছি। আমরা এসেছি দেড় বছর হলো। এরও ২৭ বছর আগে প্রফেসর আতাউর চৌধুরী এখানে এসেছিলেন। উনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের হেড…উনিই আমাদের পথিকৃত। এর বাইরে আরও দুজন প্রফেসর ছিলেন। একজন ম্যাথ আরেকজন ল্যাঙ্গুয়েজ ডিপার্টমেন্টের। উনারা দুজনই অবসরে গিয়েছেন। আশা করি এর পরেরবার এলে পুরো বাংলাদেশী কমিউটিনির সাথে আপনার দেখা করিয়ে দিতে পারবো।

সিমু নাসের/৩০ মার্চ ২০১৭, সকাল ৪:৫৬/নর্থ পোল/ফেয়ারব্যাঙ্কস/আলাস্কা/ইউএস

 

Advertisements