সেক্রামেন্টোর আলো ঝলমলে বিকেলে পার্কের বিষন্ন মেয়েটি

দিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে আজকে দুপুরে গিয়েছিলাম সেক্রেমেন্টোতে। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটের রাজধানী এই শহরটা বার্কলি থেকে প্রায় দুই ঘন্টার ড্রাইভ। অসম্ভব সাজানো গোছানো। নগর পরিকল্পনাবিদরা অনেক ভাবনা চিন্তা করে প্রচুর গাছ লাগিয়ে এই শান্তির শহরটা তৈরি করেছেন বোঝা যাচ্ছে। পরিবেশ একদম আমাদের গাছপালা ঘেরা গ্রামগুলোর মতো। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়ের মাঝখান দিয়ে শুধু একটু পর পর ঝা চকচকে ট্রেন আর বাস ছুটে চলছে। লোকজনও খুব কম। আর যারা আছে তাদের গড় বয়স ৪০। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এই লোকগুলো স্যুট টাই পড়ে ফর্মাল ড্রেসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইউনিভার্সিটি শহর বার্কলি একদম উল্টো। বার্কলিতে ছেলেদের সবচেয়ে বড় পোশাক হাফপ্যান্ট-টিশার্ট আর মেয়েদের…থাক এই সামারে সেদিকে আর না গেলাম।

সেক্রেমেন্টো শহরের রাস্তা ধরে হাটতে হাটতে এক সময় সামনে পড়ল একটা নদী–নদীর নামটা বড্ড ক্রিয়েটিভ। সেক্রেমেন্টো। একদম শহরের নামেই নাম। সেই নদীর উপর টাওয়ার ব্রিজে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল নদীর পাড়ের পার্কের ঘাসে চুপচাপ মূর্তির মতো বসে থাকা এই মেয়েটিকে। বিকেলের রোদে একটা লোকও নাই সেই পার্কে, মেয়েটি একা। একদম পাথরের বসে আছে। দশ মিনিট, বিশ মিনিট, আধা ঘন্টা পেরিয়ে এক ঘন্টা। মেয়েটি একই ভাবে বসে আছে তো আছেই। কোনও নড়াচড়া নেই। আমার কেন জানি মনে হলো মেয়েটার আজ ভয়াবহ মন খারাপ। কী কারণ জানি না। হয়ত ভালোবাসার মানুষটি তাকে ছেড়ে চলে গেছে বা নিজেই ছেড়ে এসে জীবনের কোন এক মোড়ে আন্ধা গিট্টু লাগিয়ে বসে আছে। ব্যাড়াছ্যাড়া যাকে বলে আর কি! আমার ভাবনা হলো, আচ্ছা মেয়েটা কি নদীতে ঝাঁপ দেবে? নাকি সাঁতার জানা থাকায় এভাবে কাজ হবে না বলে বিকল্প উপায় ভাবছে? আমি আমার ভাবনার কথা বললাম দিয়াকে। সে বলল, আমেরিকান মেয়েরা এত ইমো খায় না। আর খেলেও নিজের জীবন ধ্বংস করে না। আমি বললাম, আরে জায়গামতো পৃথিবীর সকল মানুষই আসলে এক। কে জানে কালকের পত্রিকায় হয়তো মেয়েটার সুইসাইডের খবর বের হবে। তখন আমাদের কী পরিমান গিল্টি লাগবে ভেবে দেখেছ? চলো মেয়েটার সঙ্গে গিয়ে কথা বলি। হাই-হ্যালো বলে অন্তত বোঝার চেষ্টা করি। মৃত্যু পথযাত্রী মনে হলে দুই একটা লেইম জোকস বলে হাসানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
untitled-1

দুজনে রওনা দিলাম পার্কের দিকে। বেশ কিছুটা হেঁটে যখন মেয়েটার পেছনে পৌঁছালাম তখনও মেয়েটা একই ভঙ্গিতে বসে আছে। ঘাসের উপর দিয়ে দুই পা এগিয়েই আমার হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা মেয়েটা আবার মেডিটেশন করছে না তো! এখানে তো আবার ইয়োগা (আমাদের যোগ ব্যায়াম আর কি), মেডিটেশন এসব খুবই সেক্সি আইটেম। আমরা গিয়ে তার ধ্যানে বিঘ্ন ঘটালে মহা কেলেঙ্কারি হবে। আমি দিয়াকে বললাম, বাদ দেই চলো। ধ্যান-ট্যান হলে অযথাই বিরক্ত করা হবে। দিয়া বললো, কথা ঠিক। এরা প্রাইভেসি খুব পছন্দ করে। তবে এ রকম হাটু মুড়ে ঠায় বসে কেউ ধ্যান করে নাকি। আমি বললাম, আধুনিক যোগ ব্যায়ামের বইয়ের ১১০তম সংস্করণে যে এই আসন নাই কে জানে! যুগের সাথে আসনও তো পাল্টানোর কথা। দিন কালের যে অবস্থা, কুকুরের নামে পর্যন্ত আসন আছে এখন!

শেষ পর্যন্ত আমরা আর গেলাম না। ও একা থাকতে চায় বলেই হয়তবা এখানে এসে বসেছে। থাকুক। দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটার এ ছবিটা তুলে দুজনে পার্কের অন্য দিক দিয়ে হেঁটে আবার শহরের কেন্দ্রে চলে এলাম। তবে বার্কলিতে ফিরে মনটা খুবই খচখচ করছে এখনো। দোটানায় পড়ে কথা না বলে ভুল করলাম না তো!

ধ্যান নাকি গভীর কোন কেস? ফেসবুকে মেয়ে মনের অলিগলি এক্সপার্টরা প্যানেল কী বলেন?

সিমু নাসের/ওয়েস্ট সেক্রামেন্টো রিভার ওয়াক/সেক্রামেন্টো/ক্যালিফোর্নিয়া/ইউএস/১৩ অক্টোবর ২০১৫

Advertisements