সূর্য উৎসবে বান্দরবান ও জিরো ফিগারের নৌকা

উত্সবের জন্য নাম নিবন্ধন করতেই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো দুই পাতার এক লিফলেট। গুটি গুটি সুতন্বীএমজে ফন্টে সেখানে নানা নির্দেশাবলি লেখা। তার মধ্যে একটি লাইনে চোখ আটকে গেল, সূর্য উত্সব কোনো বিলাস ভ্রমণ নয়। এটা একটা অ্যাডভেঞ্চারমূলক অভিযান। পুরো অভিযানে থাকা, খাওয়া, শোওয়া, গোসল, বাথরুম—সবকিছুতেই সর্বোচ্চ কষ্ট হবে। যেতে হবে এই কষ্টটা স্বীকার করেই।

সূর্য উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডাচ নাগরিক রোজান।

সূর্য উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডাচ নাগরিক রোজান।

মানলাম কষ্ট হবে। কিন্তু সাহসটাকেও যে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, সেটা কেন আগে বলা হলো না। তাই ঢাকা থেকে ৩০ ডিসেম্বর রাতে বান্দরবানগামী রাতের বাসটা যখন চলতে শুরু করল তখন বুঝলাম, বাসা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ বুকের পাটা না নিয়ে এ বাসে চড়ে কী ভুলটাই না করেছি। কোনো মনুষ্য চালকের পক্ষে এভাবে বাস চালানো সম্ভব? উঁহু। ভাবলাম, ইনি নিশ্চয়ই ভিনগ্রহের প্রাণী। আগে আন্তগ্রহ উল্কা চালাতেন। এখন পাকেচক্রে পৃথিবীতে এসে বাস চালাচ্ছেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাই চট্টগ্রামের নির্মাণাধীন আট লেনের ইট-বালু-সিমেন্ট পেরিয়ে, খানাখন্দে ঝাঁকিয়ে, আঁকা রাস্তাকে বাঁকিয়ে পৌঁছে গেলাম বান্দরবান। আহ বেঁচে আছি!

সকালের নাশতাটা বান্দরবানেই সেরে এবার উঠে বসলাম এক কচ্ছপের খোলে। তবে সেটাকেও দেখলাম সবাই বাস বলেই ডাকছে। কী জানি, হয়তোবা বাসই।

পাহাড়ি রাস্তায় মানুষ হাঁটার গতিতে চলতে শুরু করল বাস। গন্তব্য থানচি। সেখান থেকে নৌকা করে পৌঁছে যাব সারি সারি পাহাড়, ছিপছিপে নদী আর ঝরনায় স্নাত রেমাক্রি, যেখানে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে বছরের প্রথম সূর্যোদয় লগ্নের আয়োজন সূর্য উত্সব। উত্সবের পরিচালক মশহুরুল আমিন জানালেন, ১৫ বছর ধরে একই সময়ে নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অ্যাডভেঞ্চার, বিজ্ঞান আর প্রকৃতিপ্রেমীদের নিয়ে হয়ে আসছে এ উত্সব।

রাতে ফানুশ ওড়ানো সূর্য উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ

রাতে ফানুশ ওড়ানো সূর্য উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ

থানচি পর্যন্ত যেতেই পড়ে এল বেলা। সেই পড়ন্ত বেলাতেই আমার বুক ধড়ফড়ানি শুরু হলো থানচি ঘাটে গিয়ে। ঘাটভর্তি চিকন চিকন নৌকা। আর এ ভয়ংকর নৌকায় ঠায় হয়ে চার ঘণ্টা বসে থেকেই নাকি পৌঁছাতে হবে রেমাক্রি। উঠে বসলাম জিরো ফিগারের এক নৌকায়। যে নৌকা পরবর্তী চার ঘণ্টা কখনো অথই জল, কখনো জলভেজা পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে, কখনো ‘নৌকায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ হয়ে এগিয়ে চলল রেমাক্রির দিকে। মাঝির কাছে জানতে পারলাম, পাথরের ঘষায় এসব নৌকা নাকি দুই মাসের বেশি টেকে না। চারদিকে এত সুন্দর প্রকৃতি, কিন্তু ঘাড়টা খুব বেশি ঘোরানোর জো নেই। একটু ঘোরালেই কীভাবে জানি পানি উঠে পড়ে নৌকায়। ৩৬ জনের এই দলটি এক ডজন নৌকায় চড়ে মোটামুটি দম বন্ধ করেই পৌঁছে গেলাম রেমাক্রি।

_dsc1859

চলছে প্রস্তুতি। উৎসবের আগের রাতে।

আদিবাসীদের রেস্টহাউস হলো আমাদের ঠিকানা। ফ্রেশট্রেশ হয়ে একটু এদিক-সেদিক করতেই রাত। সে রাতেই মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আদিবাসী মেয়েদের নৃত্য। পাশাপাশি সূর্য মুকুট বানানোর মাধ্যমে শুরু হয়ে গেল সূর্য উত্সবের প্রস্তুতি। কিন্তু পরদিন যার জন্য এ উত্সব, তার দেখা নেই। সবাই মিলে বছরের প্রথম সূর্যকে দেখতে এসে দেখি, কুয়াশাকে চাদর বানিয়ে আড়াল করে রেখেছে মুখ। আমরা সূর্যকে লজ্জা কাটানোর সুযোগ দিয়ে রওনা হলাম নাফাখুম ঝরনার দিকে। আহ, সে কী ভয়ংকর সুন্দর যাত্রা। হালকা বৃষ্টিতে প্রত্যেকের ভাগে বরাদ্দ হলো চার থেকে পাঁচটা করে আছাড়। কিন্তু সে কষ্ট ভুলে গেলাম সবাই অপরূপ সেই জলপ্রপাতের ধারায় স্নাত হয়ে।

উৎসব উপলক্ষে আদিবাসী শিশুদের নৃত্য।

উৎসব উপলক্ষে আদিবাসী শিশুদের নৃত্য।

সন্ধ্যা ধরে আসতে না আসতেই সবাই ফিরে এলাম রেমাক্রি বাজারে, যোগ দিলাম সূর্য উত্সবের মূল পর্বে। সেখানে একদল মেতে উঠলাম টেলিস্কোপে আকাশের তারা দেখায় আর গানে, আরেক দল মাটির সরায় লাল-নীল আলোকমালা বানিয়ে পাহাড়ি নদীতে ভাসানোয়, আরেক দল আকাশে রঙিন ফানুসে করে আনন্দ ওড়ানোয়। সকাল থেকেই দেখা মিলল ঝলমলে সূর্যের। রঙিন কাপড়ে সবাই মিলে বানালাম সূর্যের প্রতিকৃতি।
কে জানি আবৃত্তি করে উঠল সুকান্তের কবিতা, ‘হে সূর্য! শীতের সূর্য!/ হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়/আমরা থাকি…শুনেছি তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড/তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে/একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হব!’

ছুটছি রেমাক্রি ঝরনার দিকে।

ছুটছি রেমাক্রি ঝরনার দিকে।

কিন্তু বুঝে গেলাম অগ্নিপিণ্ড হওয়া আর আমার হবে না। কেননা আবারও ফিরতে হবে সেই জিরো ফিগার নৌকা আর বাস নামধারী সেই একই উল্কায় করেই।

সিমু নাসের/ঢাকা/৬ জানুয়ারি ২০১৫
প্রথম প্রকাশ : ছুটির দিনে/প্রথম আলো/১০ জানুয়ারি ২০১৫

আরও ছবি>>>

Advertisements