মেনলো পার্কের ফেসবুক ওয়াল থেকে ঈদ মোবারক

 

তোপরাজ পইপই করে বলে দিয়েছে যেই দেখবেন স্টেশনে বড় বড় করে লেখা ‘মেনলো পার্ক’ তখনই লাফ দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়বেন। এরপরের টেনশন আমার ঘাড়ে। দৈত্যাকৃতির বিশাল দোতলা ট্রেন। উপরের তলাতে বসার ইচ্ছে থাকলেও তোপরাজের কথা মতো লাফ দিয়ে নামতে সুবিধা হবে বলে বসেছি নীচতলায়। স্টেশনে স্টেশনে এক-দুই মিনিট থেমে থেমে ট্রেন ছুটছে সাইসাই করে। যাচ্ছে সান ফ্রান্সিসকো থেকে সান হোসে শহরের দিকে। মাঝখানের এই পুরো জায়গাটাকেই একবারে বলা হয় সিলিকন ভ্যালি। পৃথিবী বিখ্যাতসব প্রযুক্তি প্রতিষ্টানগুলোর অফিস। তাই ‘ক্যালট্রেন’ নামের এই শাটল ট্রেনটিও পুরোটাই ভর্তি এডোবি, গুগল, ইন্টেল, ইয়াহু, ফেসবুক, এইচপিসহ হাজার হাজার ছোট বড় নানা প্রতিষ্ঠানের কর্মীতে। কামরার বেশিরভাগই ল্যাপটপ নিয়ে কাজে ব্যস্ত। কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে নীচু স্বরে কথা বলছে। আমি ব্যস্ত জানালার বাইরে গাছপালার ফাকে বড় কোন কোন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দেখা যায় তা নিয়ে।

মেনলো পার্ক ট্রেন স্টেশনে

মেনলো পার্ক ট্রেন স্টেশনে

ফেসবুককর্মী নেপালি ছেলে তোপরাজের সঙ্গে দিয়ার পরিচয় হয়েছিল এক বরফপড়া দুর্যোগময় রাতে চীনের কুনমিং এয়ারপোর্টে। এরপর থেকে তার সঙ্গে ভালো যোগাযোগ। ছেলেটার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো ভালো যোগাযোগ তৈরি করে আর প্রচুর টাকা পয়সা কামিয়ে নেপালে তরুণদের জন্য একটা আন্তর্জাতিকমানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা। সেই বলল সময় করে একদিন ফেসবুক ঘুরে যেতে চাই কিনা। আমি বললাম, অবশ্যই। যেই ফেসবুকে সারাদিন বসবাস সেই ফেসবুকের বাস্তবের ওয়াল দেখতে যাবো না তা কি হয় নাকি। ধর তক্তা মার পেরেক। তখনই ঠিক করে ফেললাম আমি আর দিয়া ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ঈদের দিন পদধূলি দেব ফেসবুকে।

ট্রেনে উঠে মনে হলো, আরে ঈদের দিনই যখন যাচ্ছি ফেসবুকে তখন বাংলাদেশি কেউ থাকলে একটু কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে আসা যাবে। ফেসবুকে কে আছে বাংলাদেশের? খোঁজাখুজির কাজে সবচেয়ে ভালো গুগল। তাই ফোন দিলাম গুগলকর্মী শিশির খানকে। উনি বললেন, হাঁ আছে তো। তিন চারজন আছে। এর মধ্যে অবশ্য একজন খাঁটি বাংলাদেশী, সরাসরি বাংলাদেশ থেকে এসেছে। আর বাকী দুইজন বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত। জন্ম বেড়ে ওঠা আমেরিকাতেই।

আমি বললাম, খাঁটি দিয়েই শুরু করি। শিশির খান বললেন, ওর নাম জিশান। ইশতিয়াক হোসেন জিশান, বাংলাদেশের আর্বোভাইরাস ব্যান্ডের প্রাক্তন বেজিস্ট। আমি বললাম, দারুন, আর্বোভাইরাস আমার ফেভারিট। ফোন নাম্বার দেন তার। উনি বললেন, আমার কাছে তো ফোন নাম্বার নাই, তবে ইমেইল ঠিকানা আছে। আমিও মেইল করি, আপনিও করেন। সাথে সাথেই জবাব পাওয়ার কথা। ট্রেন চলতে চলতেই মেইল দিলাম তাকে। ১০ মিনিটেও কোন জবাব নাই। ভাবলাম, ফেসবুকে যে কাজ করে সে হয়তবা জিমেইল জবাব দেরি করেই দেবে। বেটার ফেসবুকে ইনবক্স করি। মেইলটাই কপি করে ইনবক্স করলাম। কী আশ্চর্য পরের ১০ মিনিটেও সেটা ‘সিন’ না হয়ে জিমেইলেই জবাব এলো, ঈদের দিন হলেও আমি অফিসেই আছি, ভালোই হলো, সামনাসামনি কাউকে তো অন্তত ঈদ মোবারক বলা যাবে। তবে আড়াইটা থেকে তিনটা আমার একটা মিটিং আছে। এর আগে ও পরে আমি ফ্রি। আর এই যে আমার নাম্বার, এসে ফোন দিয়েন।

ফেসবুক অফিসের সামনের বিশাল লাইক বাটনের সামনে আমি ও দিয়া

ফেসবুক অফিসের সামনের বিশাল লাইক বাটনের সামনে আমি ও দিয়া

এইসব করতে করতে কখন যে মেনলো পার্ক পার হয়ে পরের স্টেশন পালো অলটোতে চলে এসেছে ট্রেন খেয়ালই করিনি। হুড়মুড় করে নামলাম সেখানে। আমরা পালো অলটোতে আর তোপরাজ গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আছে মেনলো পার্কে। কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। এখন উপায়? তাকে ফোন দিয়ে বললাম, শোনো, আমরা উবার (ট্যাক্সির মতোই একটা সার্ভিস যেটা সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে) করে সোজা তোমাদের অফিসে চলে আসছি, তুমিও ওখানেই আস। ২০ মিনিটের মধ্যে বেশ কিছু ডলার গচ্ছা দিয়ে হাজির হলাম ফেসবুকে।

পৌঁছে পরলাম আরেক ফ্যাসাদে। রাস্তার এপারে একটা ফেসবুক আর ওপারে আরেকটা। যাবো কোনটায়! মুশকিল আসান করতে ভোজবাজির মতো কোথা থেকে জানি তোপরাজ হাজির হলো। দীর্ঘদিন পর তার সাথে দেখা। হাই-হ্যালোর পরে সে বললো, আমরা এখন যেটায় আছি সেটা নতুন বিল্ডিং। কয়েকদিন আগেই ওপেন হয়েছে। এটার ছাদেই আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছাদবাগান। আর ওই পারেরটা পুরোনো বিল্ডিং। দুটোতেই ফেসবুকের কাজ চলে। কোনটায় আগে যাবে?

বেলা গড়িয়ে দুটা বেজে গেছে তখন। পেটে খিদে। আমি চোখ টিপি দিয়ে বললাম, যেটায় লাঞ্চ ভালো দেয় সেটায় চলো আগে। তোপরাজ হেসে দিয়ে বলল, তাইলে চল পুরোনো বিল্ডিংয়েই যাই। ওখানে খাবার ভালো। আমি বললাম তথাস্তু।

ফেসবুকের বিনামূল্যে খাবার ক্যাফে!

ফেসবুকের বিনামূল্যে খাবার ক্যাফে!

ফেসবুকের এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিংয়ের মাঝখানে ব্যস্ত রাস্তা। প্রচুর গাড়ি চলছে। যোগাযোগে জন্য তাই রাস্তার নীচ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাতাল পথ। সে পথ দিয়ে ফেসবুকের নিজস্ব নীল রঙের সাইকেল নিয়ে যাওয়া যায়, একটু লম্বাটে খোলা বাসে করে যাওয়া যায় যেটা একটু পরপরই এই বিল্ডিং ওই বিল্ডিং করছে আর হাটার ব্যবস্থা তো আছেই। তোপরাজকে বললাম, চলো হেঁটে গল্প করতে করতে চারদিক দেখতে দেখতে যাই।

রাস্তা পার হতেই চোখে পড়ল বিশাল বড় একটা ‘লাইক’ সাইন। সেটার চারদিকে আবার বেশ নকশা কাটা। অনেকটা আমাদের দেশের মিষ্টির প্যাকেটের মতো। তার নীচে লেখা ফেসবুক, ১ হ্যাকার ওয়ে। ফেসবুক ঘুরতে আসা লোকজন নানা ভঙ্গিমায় তার সামনে ছবি তুলছে। আমরাও তুললাম। আমি একটু পিছিয়ে সাইনবোর্ডটার পেছনে গিয়ে দেখি উল্টাদিকে বড় করে আরেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ‘সান মাইক্রোসিস্টেম’ এর লোগো লাগানো। তোপরাজের দৃষ্টি আকর্ষন করতেই সে বললো, ফেসবুকের এই পুরোনো অফিসটায় আগে ছিল সানের অফিস। তারা চলে যাওয়ার পর এই সাইনবোর্ডটা উল্টে শুধু ফেসবুক লাগানো হয়েছে। সাইনবোর্ড রিসাইকেল আরকি। আর সানের এই সাইনবোর্ড দেখিয়ে মার্ক মনে করিয়ে দিতে চায় যে, ঠিকঠাক মতো না চালালে যে কোন বড় প্রতিষ্ঠানই উল্টা সাইনবোর্ডে পরিণত হয়।

ফেসবুকের পুরোনো অফিসটা বাইরে থেকে দেখতে লালচে রংয়ের। একটু চতুর্ভুজ আকৃতির। সেটার গেটে ব্যাপক সিকিউরিটি। একজন আইপ্যাডে আমাদের নাম রেজিস্টার করে গলায় ঝুলানোর কার্ড দিলেন। আমরা সে কার্ড ঝুলিয়ে লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের আজব কারখানায় ঢুকে পড়লাম।

ফেসবুকের পুরোনো অফিসের ভেতরটা দেখতে একটা ছোটখাট শহরের মতো।

ফেসবুকের পুরোনো অফিসের ভেতরটা দেখতে একটা ছোটখাট শহরের মতো।

ঢুকেই মনে হলো শহরের মধ্যে যেন আরেকটা শহরে এসে ঢুকলাম। মাঝখানে সুপরিসর আঙিনা আর তার চারদিকে একটানা বিল্ডিং। জাকারবার্গের আইডিয়াই ছিল এটাকে একটা শহরেরই রুপ দেওয়া। প্রয়োজনীয় সবই আছে এই শহরে। চুল কাটার দোকান, খাবার দোকান, জুতার দোকান, কাপড় কেনার দোকান, কফিশপ, ভিডিও গেমস ইত্যাদি। আমরা আগে পেজ পুজো পরে ঘুরে দেখা নীতি নিয়ে বিশালাকায় একটা ডাইনিং হলে ঢুকে গেলাম। কত যে খাবার, কোনটা রেখে কোনটা খাই।

আধাঘন্টা পর মোটামুটি ভারি পেটে ঢুলতে ঢুলতে বের হলাম সেখান থেকে। সামনেই পড়ল একটা জায়ান্ট টিভি ক্রিন। সেই স্ক্রিনে কবে ফেসবুকে কী হবে সেগুলোর রংচঙে নোটিশ, বিজ্ঞাপন। এর নীচে কাচের দেয়াল দেয়া একটা ঘর। ঘরটা বাইরে থেকে খালিই মনে হলো। কাচের গায়ে একটা নোটিশ সাটানো—দয়া করে প্রাণীর ছবি তুলবেন না। তোপরাজ জানালো, নতুন বিল্ডিং হওয়ার আগ পর্যন্ত এই অফিসের এই কাচের ঘরে বসেই অফিস করতেন মার্ক জাকারবার্গ। ফেসবুক ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা কাচের বাইরে থেকে চিড়িয়াখানার প্রাণীর মতো করেই নাকি তার ছবি তুলতো। সেজন্য মার্ক একদিন মজা করে ‘প্রানী’র ছবি না তোলার এই নোটিশ টানিয়ে দিয়েছিলেন।

একটু সামনে এগুতেই দেখি একটা বেশ রংচংয়ে একটা দোকান। ভেতরে রংতুলির ছড়াছড়ি। মজার মজার বানী সম্বলিত নানা রংয়ের পোস্টার ঝুলছে চারদিকে। তোপরাজ জানালো, ফেসবুক অনেক স্থানীয় শিল্পীকে এখানে নিয়ে এসেছে কাজ করার জন্য। তারা ফেসবুকের নানা অনুষ্ঠানের জন্য পোস্টার ডিজাইন করে, অফিসটাকে নিজের মতো করে রাঙায়, বই ডিজাইন করে। আমরা বেশ কিছু পোস্টার চেয়ে নিলাম একজন শিল্পীর কাছ থেকে। সেখান থেকে বের হয়ে আমাদের একটু তেষ্টা মতো পেল, ঢুকে গেলাম একটা ফ্রি আইসক্রিম পার্লারে। সুস্বাদু আইসক্রিম হাতে নিয়ে ঢু মারলাম ভিডিও গেম খেলার জায়গায়, ফেসবুক ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে খেললামও কিছু্ক্ষন। স্যুভেনির শপে ঢুকে কিনলাম ফেসবুক টিশার্ট, হুডি, লাইক বাটনের চাবির রিং। তোপরাজ জানালো এই অফিসের ওয়ার্ক স্পেসে দর্শনার্থীদের ঢোকার নিয়ম নাই। চলেন ওই অফিসে যাই। ভেতরটা ঘুরে দেখাই। তবে এই অফিসে একটা মজার জিনিস আছে। অফিসের ছোটখাট জিনিস যেমন কীবোর্ড, মাউস, চার্জার ইত্যাদির জন্য আইটি ডিপার্টমেন্টে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না, ভেন্ডিং মেশিন আছে। কার্ড ছোয়ালেই নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জিনিসটা হাতে চলে আসে। আর এই ফেসবুক শহরেই শুক্রবার করে বসে মার্কের টাউনহল কিউএ সেশন। সেখানে মার্ক তার সপ্তাহের লক্ষ্যের কথা বলে আর ফেসবুকারদের প্রশ্নের জবাব দেয়।

ফেসবুক অফিসের ওয়ালে আমাদের লেখা ঈদ মোবারকের সামনে আমরা। ছবি: জিশান

ফেসবুক অফিসের ওয়ালে আমাদের লেখা ঈদ মোবারকের সামনে আমরা। ছবি: জিশান

আমরা নুতন অফিসের দিকে হাটতে শুরু করে ফোন দিলাম জিশানকে। জিশান জানালো, তার মিটিং শেষ। আমরা কোথায়। বললাম আমরা নতুন বিল্ডিংয়ের লবিতে আসছি ১০ মিনিটের মধ্যে।

লবিতে ঢুকতেই জিশান বিশাল করে ঈদ মোবারক বলে হাত বাড়িয়ে দিল। বিদেশ বিভুইয়ে এই এক সমস্যা। ঈদ পার্বনেও অফিস করতে হয়। তোপরাজকে বললাম আজ আমাদের উত্সবের দিন। তোমাকেও ঈদ মোবারক। আর তোমার এখন ছুটি। এবার তুমি কাজে যাও। এই বাঙালি ভাইকে নিয়েই এই অফিসটা ঘুরে দেখি। তোপরাজকে আপাতত বিদায় দিয়ে জিশান আমাদের প্রথমেই নিয়ে গেল নতুন বিল্ডিংয়ের প্রধান আকর্ষন এর ছাদে।

নয় একরের বিশাল এই ছাদটা দেখলে আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। চারদিকে সবুজ খেলার মাঠ, বারবিকিউ করার জায়গা, দোলনা, মাঝে আর চারপাশ দিয়ে সুন্দর হাটার রাস্তা, ল্যাম্পপোস্ট কী নাই সেখানে। ছাদ থেকে অনেক দূরে না তাকালে বোঝাই যায় না যে এটা একটা বিল্ডিংয়ের ছাদ। মনে হয় শহরেরই কোন একটা সুপরিশর পার্কে এসে হাজির হয়েছি। এখানে ইতিমধ্যেই লাগানো হয়েছে বিশাল আকারের ৪০০ গাছ। ছোট ছোট ফুল গাছের তো অভাব নেই। বিখ্যাত স্থপতি ফ্রাঙ্ক গেরির ডিজাইন করা ৪ লাখ ৩০ হাজার স্কয়ার ফিটের এই অফিসের ছাদটা এক সময় স্থানীয় পাখির কলকাকলিতে ভরে যাবে এটাই জাকারবার্গের চাওয়া। বলা হচ্ছে এটাই এই সময়ের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ছাদ বাগান। চাইলেই সেখানে কাটিয়ে দেওয়া যায় ঘন্টার পর ঘন্টা। চারদিকে অসংখ্য ফেসবুক কর্মী গল্প করতে করতে হাটছে। আমরা ঘন্টা খানে সেখানে কাটিয়ে বিস্ময়ভরা মন নিয়ে ছবি-টবি তুলে নিচে নেমে এলাম।

ফেসবুকের নতুন ভবনের ভেতরে কাজ করছে প্রকৌশলীরা।

ফেসবুকের নতুন ভবনের ভেতরে কাজ করছে প্রকৌশলীরা।

বিশাল এই ঝকঝকে অফিস ভবনে এখন কাজ করছে ২৮০০ ফেসবুক প্রকৌশলী। মাঝেমাঝে টয়লেট, মিটিংরুম আর লিফটের জায়গাটুকু ছাড়া পুরোটাই একটা খোলা জায়গা। লম্বা ডেস্কে বেশিরভাগই দাড়িয়ে, কিছু বসে, কিছু সোফায় শুয়ে কাজ করছে কর্মীরা। যতটুকু চোখে পড়লো, সবাই গম্ভীর ভাবে কোড নিয়েই খেলছে। ক্রিনে হিজিবিজি লেখা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না। ব্যাপক কর্মময় পরিবেশ। আশেপাশের যে মিটিংরুমগুলো চোখে পড়ল সবইগুলোর একটা করে নাম আছে। জিশান জানালো সবগুলো রুমের নামই বিখ্যাত কোন সিনেমার ডায়লগ, কোন ঘটনা বা প্রবাদ প্রবচনের অংশ। একপাশে একটা কাচের ঘর যার মাঝখানে একটা লম্বা টেবিল আর চারদিকে কয়েকটা চেয়ার ছাড়া কিছু নেই সেটা দেখিয়ে জিশান বলল, অফিসে এসে জাকারবার্গ এই রুমটাতেই বসে সাধারণত। তবে আজকে আসবে না। আমাদের ইমেইল করে জানিয়েছে, এ সপ্তাহে তার ভয়াবহ শিডিউল—জাতিসংঘে ভাষণ, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর ইত্যাদি। আমি ভাবলাম আহা অন্য সময় এলে নিশ্চয়ই দেখা হয়ে যেত মার্কের সঙ্গে হোক না সেটা বাইরে থেকেই।

জিসান হাটতে হাটতে সিলিংবিহীন ভবনের উপরের দিকটা দেখিয়ে বলল, এই বিল্ডিং দেখে আপনার কী মনে হচ্ছে! আমি একটু চুপ করে বললাম, মনে হচ্ছে যেন কী একটা করা বাকি আছে বিল্ডিংটায়—অসমাপ্ত। জিসান বলল, একজাক্টলি তাই। তখনই আমার মনে পড়ল নতুন বিল্ডিংয়ে অফিস শুরু করার দিন জাকারবার্গ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বলেছিলেন, ভবনের ভেতরে যারা ঢুকবে তাদের আমরা এমন একটা অনুভূতি দিতে চাই যেন মনে হয় আমরা একটা অসাপ্ত জিনিসের ভেতর আছি। এই পুরো পৃথিবীকে একই সুতোয় গাথতে আমাদের আরও কত কাজ করা বাকি। এর প্রকৌশলী সেখানে পুরোই সফল। তবে ভবনটার চারদিকে নানা ধরনের পোস্টার আর শিল্পকর্মের ছড়াছড়ি। ফেসবুক যেসব স্থানীয় শিল্পীদের কাজে লাগিয়েছে তারা মনের সুখে নানা ভাবে রাঙিয়েছে অফিস। এরই মাঝে জিসান আমাদের নিয়ে এলো একটা দেয়ালের পাশে, সত্যিকারের দেয়াল—ফেসবুক ওয়াল। যেখানে চক দিয়ে মানুষজন হাজার হাজার কথা লিখে রেখেছে। জিসান বলল, এখানে ফেসবুক দর্শনার্থী, কর্মীরা তাদের মনের কথা লিখে রেখে যায়। আপনারাও চাইলে কিছু লিখতে পারেন। ভেবে দেখলাম আজকে ঈদের দিন, তাই সবাইকে ঈদ মোবারক লিখে শুভেচ্ছা জানানোই ভালো। মোটা লাল চকে বড় বড় করে ‘ঈদ মোবারক’ লিখে ছবি তুললাম বেশ কিছু। হঠাৎ এক ফেসবুক কর্মী আমার দিকে আঙুল তুলে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, ঘুরতে এসেছ? আমি বললাম হা। তিনি বললেন, বেশ কিন্তু কোন ফেক অ্যাকাউন্ট নাই তো ফেসবুকে?

আমি বললাম, না আমার একটাই অ্যাকাউন্ট, কেন? তিনি বললেন, বেশ। ফেক অ্যাকাউন্ট খুলবে না। অপরকেও নিরুত্সাহিত করবে। ব্রিটেনে এক মহিলা নিজেই নিজের একটা ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে নিজের অ্যাকাউন্টে হয়রানিমূলক মেসেজ পাঠিয়ে ২০ মাসের জন্য জেলে ছিলেন বুঝেছ। বলে হাত বাড়িয়ে হেসে দিয়ে আমার সঙ্গে পরিচিত হলেন। তিনি একজন ফেসবুক প্রকৌশলী, এখানে আছেন ৪ বছর হয়। আমি বললাম, ফেসবুক সম্পর্কে তো আমরা সব কিছুই জানি। তুমি তো এত বছর ধরে আছ। এমন একটা তথ্য দাও যা আমরা জানি না। সে একটু ভেবে বলল, ২০১৩ সালের ফেবুকের জন্মদিনে আমি অফিস থেকে একটা স্ট্রাইপড পাজামা উপহার পেয়েছিলাম। হাহাহাহা। এই তথ্য তুমি আর কোথাও পাবে না। প্রতিবছর ফেসবুকের জন্মদিনে আমাদের বড় অনুষ্ঠান হয় আর সেখানে সবাইকে উপহার দেওয়া হয়। কবে জানি সবাই পেয়েছিল একজোড়া করে মুজা। কী শুনেছ আগে কখনো। আমি মাথা নাড়লাম। না শুনিনি। লোকটা যেমন এসেছিল হঠাতই আবার চলে গেল।

ফেসবুক অফিসের ছাদকে ছাদ বলে মনে হয় না। বিশাল একটা পার্ক যেন।

ফেসবুক অফিসের ছাদকে ছাদ বলে মনে হয় না। বিশাল একটা পার্ক যেন।

জিসান বলল, ফেসবুক খুবই মজার জায়গা। নানা ধরণের মানুষ কাজ করে এখানে। আর আমার সবাই ফেসবুক ছাড়াও নিজেদের মধ্যে সরাসরি কানেক্টেড। সে আরও জানাল ফেসবুকে কাজ করছে সে তিন বছর হলো। এখানে মূলত সে কাজ করছে ‘সার্চ’ নিয়ে। শুনেই আমি লাফিয়ে উঠলাম। বলে কি! এই একটা জিনিসই ফেসবুকের খুব দূর্বল—সার্চ। আর এই বিভাগেই কিনা আপনি কাজ করেন। কোন কিছু সার্চ দিলে ঠিকঠাক মতো খুজে পাওয়া যায় না। কাজটা কি তাইলে আপনাদের? এমনি বেতন নেন! জিসান হেসে দিয়ে বলল, কী বলেন, এই ফেসবুকেই সার্চ দিয়ে দিয়ে আপনি আপনার ৫ হাজার ফ্রেন্ড পেয়েছেন। আর আপনি বলছেন এখানে কিছুই খুজে পাওয়া যায় না। পুরোনো নতুন বন্ধু খুজে পাওয়ার চাইতে আর বড় কিছু আছে নাকি! আমি ভেবে দেখলাম কথা ঠিক। তাই চুপ মেরে গেলাম।

সিমু নাসের/১৬৪২ হারমন স্ট্রিট/বার্কলি/ক্যালিফোর্নিয়া/ইউএস/২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫
প্রথম প্রকাশ : ছুটির দিনে/প্রথম আলো/৩ অক্টোবর ২০১৫

ফেসবুক ভ্রমনের আরও ছবি>>

Advertisements