এসো নিজে করি : নুডলস স্যুপ মেইড ইন চায়না

সাংহাই বিমানবন্দরে নেমেই বুঝলাম এ অন্য দুনিয়া। চারপাশের চেনাজানা বস্তুজগত ঠিকঠাক থাকলেও ভার্চুয়াল জগতের পরিচিত আইকনগুলো ঝপ করেই যেন হারিয়ে গেলো। গেলো তো গেলই। অনেক গুতিয়েও গুগল লোগোখানা দেখিয়ে বাকিটুকুতে এসে দম হারিয়ে ফেলল। পরিবারের কর্তা যেখানে নেই সেখানে জিমেইল আর হ্যাংআউট দেখা দেয় কীভাবে। ফেসবুক আর তার মেসেঞ্জারের অবস্থাও তথৈবচ। এমন না যে চীন সরকারের ব্যান করে দেওয়া এই ভার্চুয়াল সার্ভিস না থাকলে আমি অন্ধ। কিন্তু মুশকিল হলো সাংহাইয়ে যে বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠব সেই ঠিকানাটা লেখা আছে আমার জিমেইলে আসা এক মেইলে, সেটা আর উদ্ধার করতে পারছি না। দু দিনের নোটিশে চায়না আসার আগে কে জানি একবার সতর্ক করে দিয়েছিল, যাচ্ছো তো যাও। ঠিকঠাক প্রস্তুতি নিয়েছ তো? তখনও বুঝি নাই প্রস্তুতি না নেওয়ার ফলাফল এত ভয়াবহ হবে। বুঝলে কি আর যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ভিপিএন না নামিয়ে আসি! অন্তত ঠিকানাটা কাগজে কলমে হলেও টুকে নেই। এখন?
বিমানবন্দরের এক কর্মচারীর ফোন দিয়ে নানান কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে গিয়ে বিকাল নাগাদ পৌছালাম বন্ধুর বাসায়, ৩০ তলা এক ভবনের ২১ তলার ছোট্ট খুপড়িতে।

ffff

আমাদের বন্ধু লিউ ইয়ান মানুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক। বছরে ছয় মাস সে নিজের দেশ চায়নায়, আর বাকি সময়গুলো স্বামীর দেশ হল্যান্ড, আর ইউরোপের নানা দেশ কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়ায়। তার কাজটাও বেশ ইন্টারেস্টিং। চায়নার বুমিং স্টার্টআপ মার্কেটে সে বিভিন্ন ধরনের স্টার্টআপকে একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়। তার সাথে আমাদের মিল হলো, আমাদের কেউই সাংহাইয়ের রাস্তাঘাট চিনি না। তবে লিউ বলল, এটা কোন সমস্যা না। এই যে তোমাদের জন্য কাগজের ম্যাপ।

কোন শহর সম্পর্কে মোটাদাগে একটা আইডিয়া পেতে যে কোন শহরে ঢুকেই আমার চেষ্টা থাকে শুরুতেই কোন একটা উচু জায়গা থেকে শহরটা দেখে নেওয়া। এতে শহরটার আকার, উত্তর দক্ষিণ কোন দিকে নদী আছে, কোন দিকে সাগর সেসব সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়। হঠাত্ দিক হারিয়ে ফেলার কোন ভয় থাকে না।

আর সাংহাইয়ে উচু বিল্ডিংয়েরও অভাব নাই। কিন্তু অপরিচিত বিল্ডিংগুলোতে তো আর এমনি এমনি গিয়ে ওঠার উপায় নাই। কাগজের ম্যাপ খুঁজে আমি আর দিয়া খুঁজে বের করলাম, এখানে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত একটা টিভি টাওয়ার আছে যেটার গ্লাস ফ্লোরে দাড়িয়ে পুরো শহর এক নজরে দেখে ফেলা যাবে। টাওয়ারের নাম ওরিয়েন্টাল পার্ল টিভি টাওয়ার। দিয়াকে বললাম, চলো ওটায় উঠে শহরটাই দেখে আসি আগে। কিন্তু সেখানে যাব কীভাবে। লিউ বলল, চায়নার একটা জিনিস তোমাদের জানিয়ে রাখি, এখানে সবাই মোটামুটি চায়নিজ ভাষাটা পড়তে পারে। কাজেই যে যায়গাগুলোতে তোমরা যেতে চাও বল, আমি একটা কাগজে চায়নিজে লিখে দিচ্ছি। সেটা ট্যাক্সিওয়ালাকে দেখালেই তোমাদের সেখানে নিয়ে যাবে। আর মোটামুটি তরুন বয়সীদের অনেকেই ইংরেজি জানে। কাজেই তোমাদের কাউকে কিছু ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করতে হলে বয়স্ক চায়নিজের বদলে কম বয়সীদের টার্গেট করো। জীবনরক্ষাকারী এই দুই বিদ্যা নিয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম সাংহাই দেখতে।

দিনের আলো নিভু নিভু প্রায়। চারদিকের নিয়ন বাতি আর আলো ঝলমলে সাংহাই আমাদের কল্পনার চিনদেশীয় এক শহরের তুলনায় পুরোই ভিন্ন। বিস্তর জ্যাম পাড়ি দিয়ে যখন পৌছালাম টিভি টাওয়ারে। গিয়ে দেখি কোন এক জটিল কারনে আজ টাওয়ার বন্ধ। কি আর করা। আকাশের কাছাকাছি থেকে শহরটা আজকে আর দেখা হলো না বলে সমতল থেকে দেখতে তো আর কোন বাধা নাই। টিভি টাওয়ারের সামনেই আলো ঝলমলে শহরের হাতছানি। সেদিকে একটু এগুতেই হাতের ডানে একটা অদ্ভুত কিসিমের দোকান দেখে থমকে দাড়ালাম আমরা। কাচের দেয়ালের ভেতর উঁচু লম্বা টেবিলে সারি সারি জলন্ত গ্যাস বার্নার। আগুনের হলুদ শিখাগুলো তিরতির করে জ্বলছে। এর মধ্যে বেশ কিছু সাদা পোষাকধারী লোক স্ত্রস্ত ভঙ্গিতে এদিকে সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। পুরো পরিবেশটাকে মনে হচ্ছে একটা কেমিস্ট্রি ল্যাব। একদল বিজ্ঞানী ভেতরে কোন এটা বিষয় নিয়ে তুমুল গবেষণা করছে। কিছুক্ষণ খেয়াল করার পর বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা রসায়নই বটে, তবে খাদ্য রসায়ন। কী ধরনের খাদ্য সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না। ভেতরে কয়েকজনকে দেখে মনে হলো নুডলস ধরনের কিছু একটা খাচ্ছে। পেটে হালকা খিদে আছে তাই আমরা যা থাকে কপালে ভেবে ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

উর্দি পড়া এক বেয়ারা চায়নিজ ভাষায় সম্বোধন করে আমাদের নিয়ে বসালো সারি সারি চেয়ার দিয়ে ঘেরা একটা অর্ধবৃত্তাকার টেবিলে। আমরা খুব আত্মবিশ্বাসের হাসি নিয়ে অপেক্ষা করছি এরপর কী ঘটে সেটা দেখার অপেক্ষায়। বেয়ারা একটা কেটলি টাইপের জিনিস এনে বসিয়ে দিল আমাদের চুলার সামনে। কিন্তু এই কেটলি নিয়ে আমরা কী করবো জানি না। বুঝলাম এটা একটা নুডলস স্যুপের দোকান। নিজের খাবার নিজেই টেবিলে বসে গল্প করতে করতে নিজেই বানিয়ে বানিয়ে খেতে হবে। কিন্তু আমরা তো নুডলস সুপ্যের কিছুই জানি না।

আমরা আশে পাশে লোকজনের দিতে তাকাই। তারা যা করে আমরাও তাই করি। আমাদের পাশের এক লোককে দেখলাম অদ্ভূত দর্শন একটা খাবার কেটলির মধ্যে ফেলল। আমাদের মনে হলো আমাদেরও তাই করা উচিত। কিন্তু এই ভুট্টা বা কর্ণ জিনিসটাতো আমাদের কাছে নেই। তাহলে কী করতে হবে? নুডলস তৈরির নানা ধরনের উপাদান আগে অর্ডার দিতে হবে। সেসব হাতে নিয়ে এক এক করে কেটলিতে পুরে নিজেদের মতো একটা নুডলস বানাতে হবে। কিন্তু কোনটার সাথে যে কী মিলালে যে কী হবে! ভরসা রাখলাম দেখতে সুন্দর এমন জিনিসের উপর। প্রায় ১০ পদের নানা উপাদান অর্ডার দিলাম। এরপর এক দিনিট দুই মিনিট পর পর সেগুলো কেটলির পানির মধ্যে ঢেলে দিয়ে দিলাম ঘুটা। দেখতে দেখতে সেটা এমন এক জিনিস দাড়ালো যে তা আর কহতব্য নয়। এর মধ্যে হইহই করতে করতে ২০/২৫ জনের একটা বন্ধুদের দল ঢুকে পড়লো রেস্টুরেন্টে। দেখতে দেখতেই ভরে উঠলো রেস্টুরেন্ট। আমাদের পাশে এসে সিটে এসে বসলো এক তরুনী। তাকে বললাম, একটু দেখবা নাকি আমাদের নুডলস ঠিক আছে কিনা। খেতে কেন জানি খুব বিচ্ছিরি হয়েছে। সে এক নজর নুডলস সুপ্যের চেহারা দেখে প্রায় আতকে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো কী কী দিয়েছ তোমরা এর মধ্যে। উপাদানগুলোর নাম বলতেই আক্ষরিক অর্থেই সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো—করেছ কী তোমরা, এভাবে কী কেউ নুডলস স্যুপ বানায়। দিয়া আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, আমাদের দেশে তো আমরা এভাবেই নুডলস স্যুপ বানাই। স্যুপ আমাদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার!

সিমু নাসের/সাংহাই/চায়না/ডিসেম্বর ২০১৩

Advertisements