গুগলের আমি গুগলের তুমি, গুগল করে যায় চেনা

২০০৯ সালের ১ এপ্রিল। সকাল সকাল গুগল-কর্মীরা অফিসে ঢুকতে গিয়ে হতবাক। তাঁদের মাউন্টেন ভিউয়ের বিখ্যাত অফিস বিল্ডিংয়ের চারপাশে মনের আনন্দে চরে বেড়াচ্ছে শত শত ছাগল। চারপাশে এমন সবুজ কচি ঘাসের ছড়াছড়ি দেখে এদের মাথা খারাপ—লাফাচ্ছে আর ছুটছে!

এই দৃশ্য দেখে গুগল-কর্মীরা ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোথাও বড় ধরনের কোনো ঘাপলা হয়েছে। বিনা ঘোষণায় বন্ধ হয়ে গেছে গুগল। আমেরিকায় ঘুঘু নেই বলে এর বদলে অফিস মাঠে চরছে ছাগল। মালিক ল্যারি পেজ আর সার্জেই ব্রিনও নিশ্চয়ই মোবাইল ফোন বন্ধ করে হাওয়া হয়ে গেছেন। এখন?

নেমে এল গুগল ম্যানেজমেন্ট টিম। বলল, ‘না না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’ এই ছাগল তারা নিজেরাই ভাড়া করেছে ‘ক্যালিফোর্নিয়া গ্যাজেল’ নামের একটা ফার্মের কাছ থেকে। হিসাব করে দেখেছে, প্রতি মাসে ঘাস কাটার যন্ত্র দিয়ে ঘাস কাটতে যে টাকা লাগে, তার চেয়ে কিছুটা কম পড়ে ছাগল দিয়ে ঘাস খাওয়ালে। ব্যাপারটা পরিবেশবান্ধবও হলো আবার ছাগলের বিষ্ঠা উর্বরও করে তুলল মাটিকে।
যাঁরা এই ঘটনাকে অবিশ্বাসের হাসি হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের উচিত ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিখ্যাত পাগলামিপূর্ণ অফিসটাতে জীবনে একবার হলেও এসে ঘুরে যাওয়া। যে অফিসে ঢোকার মুখেই আপনাকে স্বাগত জানাবে বিশালকায় পেট ডাইনোসর ‘স্ট্যান’। এরপর একে একে দর্শন দেবে স্পেসশিপ ওয়ান, অ্যান্ড্রয়েড মডেল পার্ক, বিশাল আকৃতির লেগোম্যান, পিঙ্ক ফ্লেমিংগো, অ্যান্ড্রয়েডের বিশাল জ্যান্ত ফোনসহ নানা কিছু। অফিসও যে এত মজাদার হতে পারে, সেটা গুগল না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

গুগল অফিসের সামনে ম্যান্ডেটরি ছবিতে আমি আর দিয়া

গুগল অফিসের সামনে ম্যান্ডেটরি ছবিতে আমি আর দিয়া

গুগল সম্প্রতি বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য একটা সংবাদসেবা চালু করেছে। এর পেছনে আছেন তিন বাংলাদেশি। ফোন আর মেইল চালাচালি করে ঠিক হলো, তাঁদের একটা ইন্টারভিউ নেওয়া হবে, আবার গুগল অফিসটা ঘুরেও দেখা হবে। টিমের প্রধান শিশির খান বললেন, ‘চেষ্টা করেন লাঞ্চের আগে আসতে। একসঙ্গে গুগল রেস্টুরেন্টেই লাঞ্চ করা যাবে, এর স্বাদ জীবনেও ভুলতে পারবেন না।’

আমি স্বাদ না ভোলার লোভে ১৫ সেপ্টেম্বর শাহরীয়ার নামের আরেক হৃদয়বান ক্যালিফোর্নিয়াবাসীর গাড়িতে সওয়ার হয়ে পৌঁছে গেলাম গুগলপ্লেক্সে, ১২টার আগে আগেই। প্রাথমিক ‘হাই হ্যালো’ সেরে শিশির খান বললেন, ‘চলেন, আমার প্রিয় কিচেন সিঙ্ক ক্যাফেতে লাঞ্চ করি আজ। এটা গুগলের সবচেয়ে হেলদি খাবারের রেস্তোরাঁ। এরপর বাকি আলাপ।’

আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। গত এক মাসের অভিজ্ঞতায় যতটুকু বুঝেছি, মার্কিনদের হেলদি খাবার মানেই হলো প্লেট–ভর্তি ঘাস-লতাপাতা। দয়ামায়া ছাড়া একদম মাঠ থেকে তুলে এনে সরাসরি প্লেটে পরিবেশন করে। ঠিকঠাক ধোয় কি না, সেটা নিয়েও ব্যাপক সন্দেহ আছে। একটু বেখেয়াল থাকলে খাওয়ার সময় নিজেকে চতুষ্পদ প্রাণী বলে মনে হয়। শেষ পর্যন্ত গুগলে এসে লতাপাতা চিবিয়ে আইডেন্টিটি হারাব?

প্রথম দর্শনেই বুঝে নিয়েছি, শিশির খান চমত্কার মানুষ। প্রায় এক যুগ ধরে আছেন গুগলে। স্বভাবতই বেশ উঁচু পদে, ক্ষমতাও অনেক। সরাসরি আপত্তি জানালে রাগ করবেন না জানি, তবু বলা তো যায় না, দেখা গেল এরপর আর আমার কম্পিউটারে ‘গুগল’ সার্চ কাজ করছে না। তাই আর ‘না’ করলাম না!

গুগল অফিসে চলছে খানাপিনা। ছবি: সিমু নাসের

গুগল অফিসে চলছে খানাপিনা। ছবি: সিমু নাসের

বিশাল এলাকাজুড়ে গুগলের অফিস। সবগুলো বিল্ডিং মিলিয়ে একসঙ্গে একে ডাকা হয় ‘গুগলপ্লেক্স’ নামে। যাতায়াতের জন্য প্রতিটি বিল্ডিংয়ের বাইরে পার্ক করা রয়েছে অসংখ্য সাইকেল। এগুলোর মালিক গুগল। সাইকেল নেওয়ার একটাই নিয়ম—নেবেন, চালাবেন আবার অন্য বিল্ডিংয়ের সামনে পার্ক করে রাখবেন। আমরাও হেলদি কিচেনের উদ্দেশে রওনা হলাম রঙিন সাইকেল নিয়ে। চালাতে বেশ মজা। বাঁ হাতে একটাই ব্রেক। তবে আরও ব্রেকের দরকার হলে প্যাডেল উল্টো ঘোরালেই সাইকেল থেমে যায়। ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম রেস্টুরেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে। গিয়ে দেখি হাজার হাজার সাইকেল পার্ক করা। সবাই হেলদির সন্ধানে এসেছে।

গুগলে সব মিলিয়ে আছে এ রকম অসংখ্য রেস্টুরেন্ট আর মাইক্রো কিচেন। গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সার্জেই ব্রিনের দর্শন হলো, কোনো মানুষকেই খাবারদাবার থেকে ২০০ ফুটের বেশি দূরে রাখা উচিত নয়। সে জন্যই যখন গুগলের অফিস ডিজাইন করা হয়েছে, তখন প্রতিটা বিল্ডিংয়েই একটা বড় রেস্টুরেন্ট ছাড়াও এর ওয়ার্কস্টেশনের আশপাশের অলিগলিতে বসানো হয়েছে খাবারভর্তি ফ্রিজ, আলমারি আর মাইক্রোওয়েভ ওভেন। কী নেই সেখানে! টক-ঝাল-মিষ্টি-ঠান্ডা-গরম-নাতিশীতোষ্ণ-আফ্রিকান-মেক্সিকান- ইন্ডিয়ান-জাপানিজ-চায়নিজ—সবই মিলবে বিনা মূল্যে। চাইলে পুরো পরিবারসুদ্ধ এখানে এসে খেতে পারবেন। আবার যদি কেউ মনে করেন প্যাকেটে পুরে বাসায় খাবার নিয়ে যাবেন, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর একটা রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় খাসির তেহারি, কাচ্চি আর মোরগ-পোলাও। গুগলে কাজ করা জনা পঞ্চাশেক বাংলাদেশির অনেককেই দেখা যায় সেখানে। খাওয়ার পাট চুকিয়ে শিশির খানের বুক করে রাখা একটা রুমে আধা ঘণ্টার ইন্টারভিউ সেশন শেষ করে আমরা এবার বেরিয়ে পড়লাম গুগল অফিস দর্শনে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এসপিওনাজ সমস্যার কারণে বাইরের দর্শনার্থীদের ওয়ার্কস্টেশনে ঢোকা নিষেধ। তবু দূর থেকেই দেখলাম টেবিলের ওপর পা তুলে, গদিতে শুয়েবসে কাজ করছেন লোকজন। নানা রঙেঢঙে সাজানো তাঁদের ওয়ার্কস্টেশন। কেউ-বা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন প্রিয় কুকুর বা বিড়ালটাকে। কর্মীদের কারোরই কোনো নির্দিষ্ট অফিস টাইম নেই। যাঁর যখন ইচ্ছা এসে নিজের কাজটুকু করে ফেললেই হলো। অনেককেই দেখতে পেলাম অফিসের বাইরের পার্কে বসে সেরে নিচ্ছেন নিজের কাজ। কেউবা ক্যাফেতে দোলনায় বসে ল্যাপটপে মগ্ন।

অফিসের ভেতরের নোটিশ বোর্ডে দেখলাম নানা কর্মকাণ্ডের লিফলেট সাঁটানো। ফ্রি চায়নিজ ভাষা শিখতে চান, মার্শাল আর্ট বা কুকুর পালনপদ্ধতি? নাকি জানতে চান কবে গুগলপ্লেক্সের কোথায় কোন সিনেমা দেখানো হবে। সব তথ্য পাওয়া যাবে এখানে।
অফিস আঙিনায় অর্গানিক বেগুন-কাঁচা মরিচের বাগান, ডাইনোসর স্ট্যান, সারি সারি রঙিন চেয়ার বসানো বিশাল হলরুম, যেখানে গুগল-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এর প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি ও ব্রিন। প্রতি বৃহস্পতিবার বসে প্রশ্নোত্তরের আসর। আমাদের নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ মঞ্চে এসে কথা বলে গেছেন।

গাড়ি করে এরপর শিশির খান আমাদের নিয়ে গেলেন ভিজিটরস বিল্ডিংয়ে। আগে এ বিল্ডিংয়ে মজিলা ফায়ারফক্সের অফিস ছিল। তারা ছেড়ে দেওয়ার পর গুগলের দোতলায় তাদের সব পণ্যের একটা করে প্রোটোটাইপ বসিয়েছে, ঘুরতে আসা দর্শকদের জন্য। ঢুকতেই বড় করে একটা মনিটর। সেখানে দেখাচ্ছে, এখন এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোন জায়গা থেকে কী পরিমাণ লোক কোন ভাষায় তথ্য খুঁজছে গুগলে। সারি সারিভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে গুগল নেক্সাস, ক্রোম আর অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন। দর্শকদের জন্য রয়েছে ম্যাসাজ চেয়ার, বিশাল বল আকৃতির আরামদায়ক বসার জায়গা। একটা ডিসপ্লে বোর্ডে ভেসে উঠছে পৃথিবী বিখ্যাত ব্যক্তি, যাঁরা গুগল অফিস পরিদর্শন করেছেন, তাঁদের ছবি। মুহাম্মদ ইউনূসকে খুঁজে পেলাম সেখানে। বিশাল বিশাল মনিটর দিয়ে বসানো হয়েছে গুগলের আর্থ, মার্স ও মুন প্রকল্প। ছবি তুললাম মঙ্গলের এক গিরিখাদে দাঁড়িয়ে। নেড়েচেড়ে খুঁজে বের করলাম ঢাকায় আমাদের বাসার স্ট্রিট ভিউ, সংসদ ভবনের থ্রিডি মডেল।

নিচে নেমে অ্যান্ড্রয়েড পার্ক ধরে হাঁটছি। পার্কের গা ঘেঁষে হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল একটা গাড়ি। নেমে এলেন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের এক তরুণ। পেছনের সিটে উঁকি দিলেন আট-নয় মাসের বাচ্চাসহ এক তরুণী। শিশির ভাইয়ের পরিচিত। আমরা এগিয়ে গিয়ে পরিচিত হলাম। গুগল দম্পতি। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে আমি পিচ্চির দিকে এগিয়ে গিয়ে গালটা একটু টিপে দিয়ে এমনি বললাম, কী খবর? কী নাম তোমার? আমাকে অবাক করে দিয়ে পিচ্চি মুখে একরাশ ফেনা তুলে অদ্ভুত একধরনের আওয়াজ করতে থাকল। সেটা আমার কানে শোনাল, ‘গুগুগুগু গুগুগঅঅল’। আমি বললাম, আরে, আপনাদের বাচ্চা তো দেখি প্রি-ইনস্টল ‘গুগল টক’ সফটওয়্যার নিয়ে জন্মেছে! আমি বাচ্চার আরেকটু কাছে গিয়ে বললাম, না না না, গুগল টক তো বন্ধ হয়ে গেছে। এটা আর করা যাবে না। তুমি আরেকটু বড় হও, একদিন ‘হ্যাঙআউট’ করা যাবে!

সিমু নাসের/বার্কলি/ক্যালিফোর্নিয়া/১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫/দুপুর ১টা
প্রকাশ: ঈদ উপহার/প্রথম আলো/২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

Advertisements