আফ্রিকার সাফারি পার্ক দর্শন ও দুই বাংলাদেশীর আমের আচার

ভোর সাড়ে চারটা। তাড়াহুড়া করে রুম থেকে বের হয়েই দেখি চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এক হাত দূরের জিনিসও ঠিকঠাক দেখা যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে ১৯৪৮৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় গেম রিজার্ভ—ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক। সেই পার্কের স্কাকুজা নামক এক ক্যাম্পের ছোট্ট এক বাংলোর দরজায় দাড়িয়ে ভাবছি এখন করনীয় কী! হাতে খুব একটা সময় নেই। গাড়ি চালিয়ে পৌনে পাঁচটার মধ্যে হাজির হতে হবে ক্যাম্পের মূল ভবনের সামনে। সেখান থেকেই খোলা জিপে করে শুরু হবে আমাদের ভোর বেলার সাফারি। ন্যাটজিও চ্যানেলে এতদিন যে সব প্রাণীদের দেখে এসেছি তাদের দেখতে পাব সামনা সামনি! উত্তেজনায় আর তর সইছে না। সিংহ কি লাফিয়ে পড়বে আমাদের উপর, নাকি হাতির ধাক্কায় উল্টে যাবে আমাদের জিপ। কোন মতে জীবন নিয়ে বেঁচে ফিরে সেই গল্প শোনাতে পারবো তো মানুষজনকে জীবনভর?

iphone-6-cape-town-3942কিন্তু আটকে গেছি শুরুতেই। গেম রিজার্ভের নির্দেশনাপত্রে পরিষ্কার লেখা আছে, কোন অবস্থাতেই রাতের বেলা নির্দিষ্ট এলাকার সুরক্ষিত ঘর আর গাড়ির ভেতর ছাড়া এক মুহূর্তও একা বাইরে থাকা যাবে না। চিতা, সিংহ, হায়েনারা রাতের বেলা বাংলোর দিকে চলে আসে। বাগে পেলে ছেড়ে কথা বলবে না। তাহলে ঘর থেকে বের হয়ে ক্যাম্পের সামনে যাওয়ার জন্য নিজেদের গাড়িতে উঠবো কীভাবে? বুঝলাম এই মামুলি সমস্যা নিয়ে বেশি ভাবতে বসলে সাফারির জিপ মিস করবো। জীবন বড় না সাফারি বড়? দেই দৌড়, যা থাকে কপালে! আমি আমার স্ত্রী দিয়াকে বললাম, লেডিজ ফার্স্ট। দৌড় দাও। কিন্তু সে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, এহ্, আগে গেলে যে বাঘে খায় এটা আমি জানি না মনে করেছ? তুমি আগে যাও।

কি আর করা! মোবাইলের টর্চের আলোতে লম্বা একটা লাঠি হাতে বোল্ট সেজে দুই মিনিটের রাস্তা দৌড়ে বিশ সেকেন্ডে ঢুকে পড়লাম গাড়িতে। দিয়াও এলো পেছনে পেছনে। টাকা এবং কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই। এরপর কাগজের ম্যাপ দেখে দেখে পৌঁছে গেলাম ক্যাম্প ভবনের সামনে।

আফ্রিকায় এখন শীতকাল। গিয়ে দেখি জিপে নাক মুখ কম্বল দিয়ে ঢেকে পর্যটকে বোঝাই হয়ে আছে জলপাই রঙের এক বাহন। নাম ঠিকানা মিলিয়ে আমাদের জিপে উঠালেন আমাদের গাইড কাম চালক ইনোক। তিনি মূলত সঙগা গোত্রের অধিবাসী। একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার এই এলাকায় এই সঙগা অধিবাসীরাই রাজত্ব করতো। কিন্তু ১৯৮৮ সালের দিকে ব্রিটিশরা এই গেম রিজার্ভ তৈরি করার সময় তাদের এক প্রকারে উচ্ছেদই করে। কিন্তু এই এলাকা সম্পর্কে এই অধিবাসীদের সবচেয়ে বেশি জানা বোঝা থাকায় তারাই এখানে এ ধরনের কাজ করে। ইনোক মানুষ হিসেবে যথেষ্ট মজার। কোন তথ্যই সরাসরি দিতে পারেন না। একটা কথার মারপ্যাচ তাতে থাকা চাই। তিনি এক গাদা নিয়মকানুন বর্ণনা করে জানালেন, এই বিশাল বনে পাখি আছে ৫১৭ প্রজাতির। আর নানা ধরনের পশু আছে ১৪৭ প্রজাতির। জিরাফ সাড়ে ৫ হাজার, লেপার্ড ২ হাজার আর হাতি আছে সাড়ে ১১ হাজার। আমরা এখন মূলত সাফারি ড্রাইভে যাচ্ছি। এর মানে হলো আমরা বনের মাঝে ঘুরে বেড়ানো নানা ধরনের পশুপাখি তাদের কোন ধরনের ক্ষতি করা ছাড়াই পর্যবেক্ষণ করবো। তবে বিগ ফাইভ দেখতে পারাটা এখানে বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। বিগ ফাইভ বলতে বোঝায় হাতি, সিংহ, গন্ডার, লেপার্ড আর মহিষ। আমাদের ভাগ্য ভালো থাকলে সবগুলোই দেখতে পারি আবার একটাও না দেখতে পারি।

kruger-signদেখা যাক আমাদের ভাগ্য আজকে কতটা সুপ্রসন্ন হয়—এই বলে তিনি জিপের চাবি ঘোরালেন। বনের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে গো গো আওয়াজ করে চালু হয়ে গেল ফোর হুইলার ডিজেল ইঞ্জিন। জঙ্গলের এখানে সেখানে ডানা ঝাপটে উঠল বেশ কয়েকটা পাখি। জিপের চার কোনায় আমাদের চারজনের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো চারটি ফ্লাডলাইড। জানানো হলো, জিপ সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলবে। আর এই ফ্লাডলাইটের আলো ফেলতে হবে আমাদের জঙ্গলের মাঝে। আর খেয়াল রাখতে হবে কোথাও আমার কিছু যেন মিস করে না যাই। গাছে রাতের বেলা লেপার্ড, চিতারা শিকার নিয়ে বসে বা ঘুমায়। কাজেই গাছের মগডাল যেন এই ফ্লাডলাইটের আওতায় থাকে। আর কারও নজরে কিছু এলে যেন মৃদু চিত্কার করে তাকে জানাই।

চলতে শুরু করলো আমাদের জিপ। সবার মধ্যেই দারুন উত্তেজনা। তীক্ষ্ন দৃষ্টি সবার বনের গাছগাছালির ফাঁকে। প্রথম ৫০ কিলোমিটার কাটলো কোন রকম প্রাণী দেখা ছাড়াই। আইস ব্রেকটা হলো আমার দিক থেকেই। ফ্লাডলাইটের আলোতে হঠাৎ বনের মাঝে টর্চের মতো কী যেন জ্বলে উঠা দেখে আমি উত্তেজনায় একটা মাঝারি আকারের চিত্কার দিয়ে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক কষে দাড়িয়ে গেল গাড়ি। সবার নজর এদিকে। শত শত টর্চ যেন বনকে আলোকিত করে ফেলেছে। তঙ্গা জানালো, উত্তেজনার কিছু নাই। এক পাল হরিন এগুলো। অন্যদের উত্তেজনা একটুও না কমলেও আমি একটু হতাশ হলাম। আমাদের সুন্দরবনেই তো কত হরিণ দেখলাম। এত কষ্ট করে এখানে এসেছি কি হরিণ দেখতে নাকি। গাড়ির অপর পাশ থেকে আরেকজন এবার চিত্কার দিয়ে উঠলো, এইটা কি, এইটা কি? আমরা তাকিয়ে দেখি এবার দুই জোড়া টর্চ জ্বলছে বনের গাছগাছালির বেশ উপরে। একটু খেয়াল করতেই বোঝা গেল এই দুই জোড়ার মালিক দুটি জিরাফ। আমি আর দিয়া উত্তেজনায় এবার লাফিয়ে উঠলাম। টিভি আর চিড়িয়াখানার বাইরে এই প্রথম আমরা বন্য জিরাফ দেখছি। কি চমত্কার, কি চমত্কার! এত উঁচু একটা বোকা বোকা প্রাণী। তবে এদের বোকা লাগার কারন কি লম্বা গলা নাকি তাদের চেহারা সেটা অস্পষ্টই থেকে গেল। মেয়ে জিরাফটি খুব বিরক্ত হলো আমাদের দেখে, সে দ্রুত অন্যদিকে চলে গেল। কিন্তু ছেলে জিরাফটি গলা উচিয়ে বেশ রাগী ভাবে আমাদের চলে না যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকলো। দিয়া বলল, রাতে মনে হয় এই জিরাফ দুটো না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই শেষ রাতে উঠে নিরবে নিভৃতে গাছের পাতা দিয়ে আর্লি ব্রেকফাস্ট করে নিচ্ছে। তাদের ব্রেকফাস্টে ব্যাঘাত ঘটায় স্বামী স্ত্রী বেজায় ক্ষিপ্ত হয়েছে। গাইড মহাশয় এই কথায় মাথা নাড়লেন। আমরাও যথেষ্ট পরিমান অন্ধকার যুক্ত জিরাফের ছবি তুলে আগে বাড়লাম।

dscf3102আঠারেশো শতকের শেষ দিকে তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকান (ট্রান্সভাল) রাষ্টপ্রধান পল ক্রুগারের উদ্যোগে তৈরি এই ক্রুগার গেম রিজার্ভ মূলত লিমপোপো আর এমপুমালাঙ্গা প্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত। এর উত্তরে জিম্বাবুয়ে আর পূর্বে মোজাম্বিকের সীমান্ত। আর এই বনে ঢোকার জন্য রয়েছে সাতটি ফটক। এই ফটকগুলোর আশে পাশেই রয়েছে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা—ক্যাম্প। এর ক্যাম্পগুলো একটি থেকে আরেকটি দুরত্ব বিশ থেকে আড়াইশ তিনশ কিলোমিটার।

পূর্ব আকাশ যত ফর্সা হতে থাকলো পুরো বনে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা রাস্তায় দেখা যেতে থাকলো বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে আসা পর্যটকে বোঝাই জিপ। চালকরা একে অপরের সাথে কথা বলে জানালো বনের কোন দিকে আজ কোন প্রাণী দেখা গিয়েছে। আমরা এবার রওনা দিলাম হাতি দেখার উদ্দেশ্যে। এতক্ষণ বনের রাস্তার ধারে আমরা প্রচুর হাতির বিষ্ঠা দেখেছি। গাইড জানালো এগুলোর দায়ভার শুধু হাতিকে দিলেই হবে না, গন্ডারকেও দিতে হবে। বলতে না বলতেই আমাদের রাস্তা ফুড়ে উদয় হলো এক পাল হাতি। আর বনের মাঝে দুইটি কালো গন্ডার। উত্তেজনায় আমরা মোটামুটি পাগল হয়ে গেলাম। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে হাতিগুলো এক মনে গাছের ডালপালা ভেঙ্গে পাতা খেয়ে চলছে আর গন্ডারগুলোর যেন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। আমাদের পাত্তাই দিলো না। আমরা সেখানে দশ মিনিট থেকে আরেকটু আগে বাড়তেই জিপ আচমকা ব্রেক কষে দাড়িয়ে গেল। গাইড ফিস ফিস করে জানানো, সবাই ডানে তাকান। তাকিয়ে আমাদের দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। একটা সিংহী অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে রাস্তার পাশে। তার ভাব ভঙ্গি দেখে গাইড বলল, ওই যে অদূরে পাথরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে সেখানে এর বাচ্চা রেখে এসেছে। সেজন্যই সে রাস্তার পাশে এসে তাদের পাহারা দিচ্ছে।

ততক্ষনে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে আরও দেখলাম জেব্রা, মহিষ, ইমপালা, কুডো, শুকর, বানর, জলহস্তি, কুমির, সাদা গন্ডার, ধনেশ পাখিসহ নানা ধরনের পাখি। বিগ ফাইভের মধ্যে কেবল বাদ পড়লো লেপার্ড। তবে গাইড জানালেন, এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই, দিনের বাকিটা পড়েই আছে। নিজেরা গাড়ি চালিয়ে বনের মধ্যে ঢুকে পড়লে চিতা আর লেপার্ড দেখা অসম্ভব কিছু না। সকাল আটটা পর্যন্ত চললো আমাদের জিপ। এরপর ফিরে এলাম ক্যাম্পে। সেখানে নাস্তা করতে বসে নীচে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি একমনে একটা জলহস্তি ঘাস খেয়ে যাচ্ছে। টেলিলেন্স ছাড়া কিছু ঝাপসা ছবি তুলে আমরা রুমে এসে ব্যাগ গুছিয়ে কিছু শুকনা খাবার আর পানি নিয়ে নিজেদের গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম সাড়ে ১৯ হাজার কিলোমিটারের এই গহীন বনে।

dscf3225তবে তার আগে ক্যাম্পের নোটিশ বোর্ডে দেখে নিলাম রেঞ্জারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বানানো ম্যাপ। বনের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে আছে গোপন ক্যামেরা। সেসবে বনের র্যাঞ্জাররা প্রাণীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া আজ সকালে এবং গতকাল সারাদিন কোথায় কোথায় কোন প্রাণী দেখা গিয়েছে সেগুলোরও একটা তালিকা দেওয়া আছে সেখানে। আমাদের এবারের লক্ষ্য চিতা আর লেপার্ড দেখা। তাই এই দুটো বনের যে এলাকায় দেখা গেছে সেদিকে গাড়ি ঘুরালাম। সেই সকাল থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বনের যতটুকু পারলাম ঘুরলাম। চিতা আর লেপার্ডের দেখা না পেলেও সারাদিন কাটলো দারুন উত্তেজনায়। আমাদের অবাক করে দিয়ে একদল জিরাফ আমাদের গাড়ি থামিয়ে দিয়ে  রাস্তা পার হলো, কতগুলো উটপাখি দৌড়ে দৌড়ে কোথায় জানি চলে গেল, রোদে কাহিল হয়ে এক পাল জেব্রা আমাদের গাড়ি থেকে দুই হাত দূরে গাছের ছাড়ায় চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলো, দুপুরের প্রচন্ড গরমে এক পাল হাতি নেমে পড়লো বনের ছোট্ট একটা হ্রদে। সেখানে বেশ খেলা জমলো লুকিয়ে থাকা কুমির আর পানি খেতে আসা হরিনদের মাঝে। ভুস করে কোথা থেকে জানি মাঝখান থেকে ভেসে উঠলো এক পাল জলহস্তি।

এইসব দেখে দেখে যখন ক্লান্ত তখন গভীর জঙ্গলের জনমানবহীন এক জায়গায় গাড়ি রেখে আমরা চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম চিতা দেখার জন্য। অপেক্ষা করতে করতে কখন যে আমরা নিজেরাই গাড়িতে ঘুমিয়ে গেছি জানি না। কে জানে হয়তবা চিতারা ক্লান্ত ঘুমন্ত আমাদের দেখে আর ঘুম থেকে জাগায়নি। উঠে দেখি বেলা গড়িয়ে বিকাল। এবার ফেরার পথ ধরতে হয়। রাতেই বিমানে করে যেতে হবে আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণের শহন কেপ টাউনে। আর বিমানটি  ধরার জন্য এখন  Kruger পার্ক থেকে গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে ৮৫১ কিলোমিটার দূরের জোহানেসবার্গ বিমানবন্দরে।

dscf3269কখন এই ভাড়া করা গাড়িটি ফেরত দিয়ে চড়ে বসবো বিমানে এই ভাবতে ভাবতে যখন গাড়ি ছুটিয়ে চলছি আফ্রিকার এক গ্রামের পাশ দিয়ে হঠাৎ বামে চোখে পড়ল একটা দোকান—বাংলা সুপারমার্কেট। ঘ্যাচ করে ব্রেক করে গাড়ি থামিয়ে ঢুকলাম সেই দোকানে। দেখি ফেণীর তিন তরুন এখানে মনোহারীর দোকান দিয়ে বসেছে। বেশ চাল্লু দোকান। আমরা একে অপরকে দেখে অবাক। কেউ এখানে বাংলাদেশি আশা করেনি। তাদের সম্বিত ফিরতেই আমাদের কি দিয়ে আপ্যায়ন করবে বুঝতে পারছে না। আমাদের হাতে তুলে দিল এক বয়াম আমের আচার। এখানে নাকি প্রচুর আম হয়। তাই আমের আচারও এখানে খুব জনপ্রিয়। আমরাও আর কি করি। ভালোবাসার বয়াম ভরা আচার খেতে খেতে গাড়ি ছুটালাম মাইলের পর মাইল লম্বা জনপদহীন রাস্তা ধরে।

Advertisements