আমেরিকান রসিকতা: এ বাটার সে বাটার নয় তো!

এই ঈদের তিনদিন আগে আমাদের হঠাৎ নেশা চাপলো বিরিয়ানি খাবো। দিয়া রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করার ব্যাপারে পিএইচডি। সে দ্রুতই ইয়েল্পে একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করে রিভিউ ঘেটে জানালো, দোকান খারাপ না, লোকজন ভালোই বলে। আমি বললাম, ভারতীয় লোকজন তো ভারতীয় খাবারের দোকানকে ভালোই বলবে। তারা কি আমাদের মতো নাকি, তাদের নরকে ঠিকই পাহারাদার লাগে। খাবার আমাদের ভালো লাগবে কিনা সেটাই কথা।

উপায় নাই গোলাম হোসেন তাই দুপুরে গোসল টোসল সেরে, সেজেগুজে আমরা রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এরপর? লং স্টোরি শর্ট। আমরা যে বুদ্ধি করে একটাই বিরিয়ানি অর্ডার করেছিলাম সেজন্য নিজেদের বুদ্ধির উপর আস্থা বেড়ে গেল। টাকাও গেল অল্পের উপর দিয়ে। নামে ব্যাপারটা বিরিয়ানী ছিল বটে, ইনফ্যাক্ট দেখতেও বিরিয়ানির কাছাকাছিই ছিল কিন্তু জিনিসটা স্বাদের দিক থেকে কী ছিল জানি না। আমাদের স্টারে কাচ্চি বিরিয়ানী খাওয়া জিহবাকে কি আর হায়দ্রাবাদী লম্বা চালের বিরিয়ানী তৃপ্ত করতে পারে?

দোকানের লোক খাবার দেওয়ার একটু পরেই এসে জিজ্ঞেস করলো বিরিয়ানী খেতে কেমন। আমার তখন মেজাজ বিস্তর খারাপ, বললাম ভালোই তবে স্টারের মতো না। স্টার? বললাম, হা স্টার। স্টার রেস্টুরেন্ট এই পৃথিবীর সেরা কাচ্চি বিরিয়ানী বানায়। বিশেষ করে কারওয়ানবাজারের স্টার। তুমি চাইলে আমি তাদের রেসিপি জোগাড় করে দিতে পারি। তিনি সন্দিহান চোখে বললেন, তুমি কোন দেশি? আমি বললাম, আমরা অবশ্যই ভারতীয়। কিন্তু কয়েকদিন আগেই ঢাকায় গিয়েছিলাম বাংলাদেশের। সেখানকার স্টার নামের একটা রেস্টুরেন্টে যে বিরিয়ানী খাইলাম সেইটার কোন তুলনা নাই। আহ, কী টেস্ট! সারা পৃথিবীর কাচ্চি বিক্রেতাদের উচিত স্টারকে ফলো করা। লোকটি ভুল বুঝে মোবাইল বের করে ফেসবুকে স্টারকে ফলো করা শুরু করলো।

কাচ্চির নেশা বড় নেশা। এটা সহজে কাটে না। আমি আর দিয়া এরপর একটা নেপালি আর একটা পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট খুজে বের করলাম। সেসবে গিয়ে অর্ডার না দিয়ে অনেকক্ষন বসে থেকে অন্যদের অর্ডার দেওয়া কাচ্চির চেহারা দেখে বুঝলাম, কাহিনী একই। ইনফ্যাক্ট অবস্থা আরও খারাপ। এদেরও স্টারের জ্ঞান দিতে হবে। আমাদের কপালে কী তাইলে আজকে আর মনের মতো কাচ্চি নাই? আর আমাদের বাসার আশো-পাশে বা ১০ মাইলের মধ্যে এমন কোন বাঙ্গালী পরিবারও থাকে না (থাকলেও চিনি না) যেই আন্টিকে কাদো কাদো গলায় বললে আমাদের কাচ্চি রান্না করে খাওয়াবে। তাইলে?

আইডিয়া! নিজেরাই কেন কাচ্চি রান্না করি না?

ওইখানে বসেই রেসিপি সার্চ দেওয়া হলো অনলাইনে। সেইখানে মহা মুশকিল। রেসিপি দিয়ে অনলাইন ভরে রেখেছে দিদিরা। অনেক খুঁজে পেতে একটা আমাদের দেশি রেসিপি খুঁজে পেলাম। (বাংলাদেশী রান্না বিশারদ ভাই ও বোনেরা আমার, খালি টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান না করে ভালো দেখে একটা বাংলা/ইংলিশ রেসিপি সাইট কেন বানান না আপনারা? যেইটা গুগল সার্চে আসে। আরেকবার বিপদে পড়েছিলাম রাধুনি খিচুরি মিক্স রান্না করতে গিয়ে। ওজন কমানোর জন্য প্রস্তুত প্রনালী লেখা কাগজের প্যাকেট বাংলাদেশে ফেলে এসেছিলাম। সেইটা পাইতে হইছিল পরে বাংলাদেশে একজনকে ফোন করে। আরে যন্ত্রনা।)

ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। জিনিসপাতির লিস্ট করে আমরা উঠলাম রেস্টুরেন্ট থেকে। দিয়ার একটা ছোট্ট কাজ আছে তার ইউনিভার্সিটিতে। এদিকে বাসার পাশের সুপার মার্কেট ‘বার্কলি বৌল’ বন্ধ হয়ে যাবে একটু পড়েই। কাজ ভাগ করে নিলাম। দিয়া মাংস কিনবে তার ইউনিভার্সিটির পাশের এক দোকান থেকে। আর আমি বাকি জিনিসপাতি কিনবো বৌল থেকে। এরপর কমন একটা বাসস্টপে আমরা দেখা করবো। তাইলে সেই কথাই রইলো…এই বলে মনে রাখার সুবিধার্তে উপকরণের লিস্ট মোবাইলের নোটসে লিখে নিয়ে আমি দোকানের বাসে উঠলাম।

সুপার শপে পৌঁছাতে বেশ সময় লাগলো। গিয়ে দেখি আর মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। আমি তাড়াহুড়ো করে জিনিস কিনছি। কোন ভুল যেন না হয়। খুব সাবধান। রাতের কাচ্চি যেন মুখে তোলা যায়। চাল কিনলাম, পেয়াজ কিনলাম…অমুক কিনলাম…তমুক কিনলাম…এবার বাটার কিনতে হবে। এর মধ্যে সুপার শপের মাইকে ঘোষণা আসছে, সম্মানিত ক্রেতা সাধারণ, আর দশ মিনিটের মধ্যেই এই দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। আপনারা এদিক সেদিক ঘোরাফেরা না করে…। তাড়াহুড়া করে দোকানের একটা লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই না ভালা আমার, বাটার কোন আইলে বলতে পার। সে একটু ভেবে বলল, অমুক আইলে পাবা, তাড়াতাড়ি যাও। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি, আরে চোখের সামনেই তো বাটার। বড় করে লেখা আছে বাটার। আমি দ্রুত এক বাক্স বাটার শপিং কার্টে নিয়ে দাম দেওয়ার জন্য কাউন্টারে দাড়ালাম।

বাসায় এসে ব্যাগ থেকে জিনিপত্র বের করছে দিয়া। আমি বসেছি কম্পিউটারে আরও সহজ কোন রেসিপির আশায়। হঠাৎ দিয়া বলে উঠল, এইটা কী আনলা তুমি? তুমিও আমার মতোই ভুল করছ। হাহাহাহা। আমার বুকের মধ্যে ধাক করে উঠল। ভুলভালে কোন জিনিস আনলাম না আবার? রাতের কাচ্চি কী তাইলে হবে না। সব তো দেখে দেখেই আনলাম।

দিয়া আমার চোখের সামনে হাসতে হাসতে বাটারের কৌটা ধরে বলল, দেখ এখানে বড় করে কী লেখা আছে। আমি অবাক হয়ে পড়লাম সেখানে লেখা– আই কান্ট বিলিভ ইটস নট বাটার। বাটার শব্দটা বড় করে লেখা। আর বাকিটুকু ছোট হরফে। তাড়াহুড়ো বা অন্যমনস্কভাবে কিনলে লোকে আসলে এটাকে বাটার মনে করেই কিনবে। স্পষ্ট করে বাটার লেখা থাকার পরেও এটা আসলে বাটার না। হোয়াট দ্য ফা*? আমি চিৎকার করে উঠলাম, এই ফাইজলামির মানে কি?

hello1

দিয়া হাসতে হাসতে বলল, আপসেট হইয়ো না। তোমার চোখ ঠিকই আছে। তোমারে কী বলবো, আমি নিজেও এই ভুল করছিলাম এর আগে। আসলে তোমারে আগেই সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিল। বাটার অংশটা বড় করে লেখা থাকায় বাকি কী লেখা সেইটা আর চোখে পড়ে না। তবে এইটা বাটারের কাছাকাছি জিনিসই। কাজ চলে যায়। আমি বললাম, আমি নিশ্চিত এই ভুল ৯০ ভাগ আমেরিকান করে। অনেকে হয়তবা তার পার্টনারের কাছে ঝাড়িও খায়। প্রতিটা পরিবারেই এই ‘বাটার’ কিনতে গিয়ে একটা করে গল্প তৈরি হয়। কোম্পানি হয়তবা এইটাই চাইছিল। আমেরিকান রসিকতার এটা আরেকটা ভালো উদাহরণ পাওয়া গেল। তবে আর যাই বল না কেন এইটা কিন্তু আসলেই দারুন একটা পলিসি।

আর ভাবলাম, এই মাল বাংলার বাজারে থাকলে বাংলার স্বামীরা বাজার করে বাসায় ফেরার পর কী কী কান্ড হতো!

সিমু নাসের/বার্কলি/ক্যালিফোর্নিয়া/ইউএস/দুপুর ১২টা/১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements