দিনে দুপুরে ঝিঁঝিঁ পোকা ও বোতল বন্দী ভূত

IMG_2397

দোকানটায় ঢোকার মুখেই থমকে দাঁড়ালাম। শব্দটা খুব চেনা চেনা লাগছে। এক সাথে হাজার হাজার ঝিঝি পোকা ডাকলে যেমন আওয়াজ হওয়ার কথা তেমন হাই ফ্রিকোয়েন্সির আওয়াজ। কিন্তু বাইরের আকাশে ঝকঝকে রোদ। ভেতরটাও আলো ঝলমলে। ভাবছি এই দিনে দুপুরে এখানে এত ঝিঁঝিঁপোকার ডাক আসবে কোথা থেকে। নাকি বিদেশি ঝিঁঝিঁপোকারা দিনের বেলাতেই ডাকে। আমাদেরগুলো একটু লাজুক বলে রাত ছাড়া মুখ খোলে না। ব্যাপারটা নিয়ে বেশিক্ষন ভাবতে পারলাম না। কখন জানি ছায়ার মতো দুটো বিশাল আকারের কুকুর সামনে উদয় হয়ে লোলুপ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভেতর থেকে কেউ একজন পিটার-জ্যাক বলে ডাকতেই কুকুরদুটো সরে গিয়ে আমাকে দোকানের মধ্যে ঢোকার জায়গা করে দিল। আমার আÍায় একটু পানি এলো।

দোকানের মধ্যে পা রাখলাম। আর রেখেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একি কান্ড। বিশাল বড় একটা গুদামের মতো  দোকান। চারদিকে সারি সারি নানা আকারের কাচের বাক্স। আর সেসব বাক্সে কী নাই–একদিকে বিশাল বড় বড় সব অজগর, হলুদ-সবুজ নানা রঙের সাপ আর অন্যদিকে ব্যাঙ, গিরগিটি, কচ্ছপ, মাকড়শা, গুইসাপ, গুবরে পোকাসহ নানা ধরনের উভচর আর সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী। কোনটায় সাপগুলো কিলবিল করছে কোনটায় গিরগিটিগুলো ঘাড়ের পেশিগুলো ছোট-বড় করছে।

ঢোকার মুখে হাতের বামে বিক্রয়কেন্দ্র। সেখানে বেজায় ভিড়। কেউবা মাত্রই বাসায় পালার জন্য কাচের বাক্সসহ একটা সাপ কিনে টাকা বুঝিয়ে দিচ্ছে। কেউ বা নিজের পালিত সাপ বা অন্যান্য প্রাণীর খাবার ইঁদুর, মুরগির বাচ্চা, ছোট খরগোশ, ঝিঝি পোকা ইত্যাদি কিনছে। ইঁদুর পাওয়া যাচ্ছে সেখানে নানা রকমের। বড়, ছোট, জ্যান্ত আর ফ্রোজেন। মানুষ সেসব প্যাকেটে করে কিনে বাড়ি যাচ্ছে। সাপের ক্রেতা সবাই দেখলাম মধ্যবয়স্ক বা তরুন। আর মাকড়শা ও ব্যাঙের ক্রেতা সবাই সাত-আট বছরের শিশু। দোকানের নাম ইস্ট বে ভিভারিয়াম। এটি নাকি ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলি শহরের সবচেয়ে বড় দোকান যারা উভচর, সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণী বিক্রি করে।

11011722_10152933722478697_3835544920066049061_nমিথ্যা না। সত্যিই দোকানটা অনেক বড়। আমি ঘুরে দেখতে বের হলাম এক ধার থেকে। বাক্সের ভেতর প্রতিটা প্রানীর বসবাস উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে। মাকড়শাগুলো নট নড়নচড়ন হয়ে বাক্সের মধ্যে রাখা শূকনো ডালে ঝুলছে। সাপগুলো কিলবিল করছে নয়তো মরার মতো পড়ে আছে। ব্যাঙয়ের জন্য গাছপালা দিয়ে ঝোপঝাড় আর একটু কাদা কাদা করে রাখা। সেখানে মাথা বের তাকিয়ে আছে ক্রেতাদের দিকে। আর সেখানেই উন্মোচিত হল আমার ঝিঝি পোকার রহস্য। খাদ্য হিসেবে শত শত ব্যাঙের বাক্সে ছেড়ে রাখা হয়েছে হাজার হাজার ঝিঝি পোকা। সেসব ঝিঝিপোকা ব্যঙের ভয়ে জীবন দিয়ে এই দিনে দুপুরে ডেকে যাচ্ছে। আহারে। ঝিঝিপোকাগুলোর জন্য খুব মায়া হলো। কিন্তু খাদ্য শৃঙ্খল বলে একটা কথা আছে। একজনকে খেয়েই আরেকজন বেচে থাকে। না হয় পৃথিবীই টিকবে না।

Bhuut_ (2)হাটতে হাটতে চলে এলাম নানা রংয়ের গিরগিটির বাক্সগুলোর কাছে। সেখানে দেখি সাত-আট বছরের বাচ্চা একটা ছেলে একটা বয়াম বুকে চেপে ধরে গিরিগিটির দিকে একমনে তাকিয়ে আছে। আমিও অপূর্ব রঙিন সেই গিরগিটিটাকেই দেখছিলাম। হঠাৎ নজর পড়লো ছেলেটার বয়ামের উপর। সেখানে ইংরেজিতে লেখাÑআমার পোষা ভূত। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকলাম। সে আমাকে দেখে বলল, হাসছ কেন? আমি দাত কেলিয়ে বললাম তোমার ভূতের বয়াম দেখে। এটার ভেতর কি সত্যি ভুত আছে?
ছেলেটা বলল, হা অবশ্যই আছে। আমি সামনের অক্টোবরের হ্যালোইন উপলক্ষে এটা কিনেছি দুই দিন আগে। ৫০ ডলার নিয়েছে। সারাদিন আমার সাথে সাথে থাকে। রোমানিয়ান ভূত। নাম মোরোই। আমি বললাম, বাহ খুব সুন্দর নাম তো। ছেলেটা বলল, মোরোই হলো রোমানিয়ার খুবই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভূত। আমি বললাম, বাহ। ভালো জিনিসই কিনেছ। ভূত যত পুরোনো হয় ততই ভালো। মনে মনে ভাবলাম, আহা কী চমৎকার শৈশব এই ছেলেটার। কী সুন্দর একটা ভূতের বাচ্চা কিনেছে দোকান থেকে। আবার বিশ্বাসও করে যে এর মধ্যে ভূতের বাচ্চা আছে। কী সরল জীবনের এই সময়টুকু।

Bhuut_ (4)আমি আরেকটু কাছে এসে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী নাম তোমার? সে বলল, পিটার। বলেই সে আবার বোতলটা বুকের কাছে আকড়ে ধরে গভীর মনোযোগে গিরগিটির শরীরের রঙ বদলায় কিনা দেখা শুরু করলো। মনে মনে ভাবলাম, এই যুুগের একটা ছেলের নাম কেন পিটার হবে। এটাতো বেশ প্রাচীন আমলের একটা নাম। পিটার গিরগিটির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, তুমি আসলে বিশ্বাস করো নি যে এই বয়ামের মধ্যে সত্যি সত্যি একটা ভূতের বাচ্চা আছে। আমি বললাম, সত্যি কথা যদি বলতে বলো তাহলে বলি সত্যিই আমি বিশ্বাস করিনি। তবে ভূতের গল্প বিশ্বাস করি আমি। তুমি চাইলে তোমার ভূতের বাচ্চা মোরোইয়ের গল্প বলতে পার।
আচ্ছা ঠিক আছে বলে পিটার বলল, এই মাত্র মোরোই আমাকে জানাল তুমি কি ভাবছ। তুমি ভাবছ, পিটার এটা আবার কেমন নাম? কি ঠিক বলেছি না? আমি একটু চমকালাম। তবে কিছু বললাম না। এমন কাকতালীয় ব্যাপার হতেই পারে। ছেলেটি আবার বলল, আর আমরা দুজনে কেন গিরগিটির সামনে সকাল থেকে বসে আছি জান?
-কেন?
-গিরগিটি কীভাবে রঙ বদলায় এটা দেখে মোরোই শিখছে। পুরোপুরি শিখে উঠতে পারলেই আমাকেও সে নানা প্রাণীতে পরিবর্তন করতে পারবে। মোরোই খুবই শক্তিশালী ভুতের বাচ্চা। দ্রুতই সব শিখে ফেলে। সে এরই মধ্যে একটু একটু পারছে। এই আধা ঘন্টা আগে আমাকে একবার দুই মিনিটের জন্য একটা কুকুর বানিয়ে দিয়েছিল। তুমি যখন দরজা দিয়ে ঢুকছিলে তখন দুইটা কুকুরের একটা আমি ছিলাম। আমার নাম পিটার ছিল তখনও। খেয়াল আছে?

Bhuut_ (3)

আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পিটার উঠে দাড়িয়ে বলল, এই যে দেখ আমার আর মোরোই এর বোতলের কোন ছায়াও পড়ছে না। সত্যিই দেখলাম তাদের কোন ছায়া পড়ছে না। তবে আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম মাথার উপর একটা বাল্ব। তাই উপর থেকে আলো পড়ায় হয়ত ছায়া দেখা যাচ্ছে না। পিটার আমার মনের কথাটা ধরে ফেলে বলল, মাথার উপরের বাল্বের জন্য না, বাইরে গেলেও সূর্যের আলোয় ছায়া পড়বে না। বলেই সে বোতলটা বুকে চেপে ধরে দোকান থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। এমন আজগুবি কথা প্রমানের জন্য আমি আর বের হলাম না। আমি আবার গিরগিটি দেখায় মনোযোগ দিলাম।

একটু পরেই মনটা কেমন জানি খুতখুত করতে লাগলো। মনে মনে খুজতে থাকলাম সেই কুকুর দুটোকে। কাউন্টারের পাশেই চোখে পড়ল একটাকে কিন্তু আরেকটা কই। আধা ঘন্টা ধরে খুঁজলাম ভেতরে। কিন্তু কোথাও নাই। জিজ্ঞেস করলাম কাউন্টারের মেয়েটাকে, আচ্ছা তোমাদের পিটার নামের কুকুরটা কোথায়, অনেক্ষণ হয় দেখছি না যে? মেয়েটা চোখ কপালে তুলে বলল, পিটার? আমাদের কুকুর? না এই নামে তো কোনো কুকুর নাই আমাদের।

(প্রথম প্রকাশ: কিশোর আলো, অক্টোবর ২০১৫)

Advertisements