ঘরের ভেতর দেশ ও হরতালের লাভক্ষতি

Rik Rossane

আমাদের বাসার ড্রয়িং রুমের দেয়ালে ম্যাপের সামনে রিক, রোজ, দিয়া ও সিমু

হরতালের লাভ ক্ষতি বিষয়ক নানান লেখা ছোটবেলা থেকেই পত্র-পত্রিকায় পড়ে আসছি। সেখানে দেখেছি লাভের চাইতে ক্ষতিই বেশি। তবে গতকালের হরতালে আমাদের একটা লাভ হয়েছে। বাসার ড্রয়িংরুমের বিশাল দেয়াল জুড়ে একটা বিশ্ব মানচিত্র অাঁকা হয়েছে। যেটা আমরা দীর্ঘ এক বছর হয় করার পরিকল্পনা করেছি কিন্তু আমরা অলসতার কারনে করে উঠতে পারিনি।

রিক আর রোজান নামে দুই ডাচ তরুন-তরুনী এসেছে বাসায় কয়েকদিন হয়। উদ্দেশ্য অতি মহৎ। পর্যটন। ৩০ দিনে বাংলাদেশের যতটুকু পারা যায় তারা ঘুরে দেখবে। নয়মাস হয় তারা ঘর ছেড়েছে। নিউ জিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ, মায়ানমার হয়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকেছে। তো দেশ ঘোরার আগে ওয়ার্মআপ হিসেবে আমরা তাদের ঢাকার সহজ সরল অংশগুলোতে এ কদিন ঘুরতে পাঠিয়েছি, দিয়া পুরান ঢাকার একটা অংশে নিয়ে গেছে, বিশ্বকাপ গলি দেখেছে, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বিটিভির কনসার্ট দেখেছে, স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলেছে, ওডিসিতে গিয়ে সস্তায় কাপড় কিনেছে, রাস্তার পাশের কি না কি খেয়ে পেট খারাপ করেছে আর সব কিছুতেই মুগ্ধ হয়েছে।

rossane 2

সিলেটের এক চা বাগানে একান্ত মুহূর্তে রিক ও রোজান

গতকাল হরতালের আগের দিন রাতে আমরা বললাম কালকে তো হরতাল। বাসার আশে পাশের এলাকা ছাড়া বেশিদূর যাওয়া মনে হয় তোমাদের ঠিক হবে না। তারা মাথা নেড়ে বলল, তথাস্তু। আমি এরপর অফিসে চলে এসেছি। বাসায় ফিরে দেখি এই বিশাল মানচিত্র। কীভাবে? আমি চলে আসার পরই তারা আলোচনা করেছে এভাবে বাসায় বন্দি না থেকে কিছু একটা করা দরকার। দিয়াকে বলল, কী করা যায়। দিয়া তাদেরকে আমাদের ম্যাপ আকার দীর্ঘদিনের এই পরিকল্পনার কথা বলল…এবং আমরা যে অলসতা আর সময়ের অভাবে এটা করতে পারছি না সেটাও জানালো। রিক সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠলো, ইয়েস উই ক্যান পেইন্ট। এখানে রিক সম্বন্ধে একটু বলে নেই, দুনিয়ার সবকিছুতেই তার আগ্রহ। দারুন কর্মঠ ছেলে। হলান্ডে তার পরিবারের একটা বিশাল ঘোড়ার ফার্ম আছে। সেখান থেকে তারা ইউরোপের সেরা ডান্সিং ঘোড়া তৈরি করে। সেসব ঘোড়া আবার অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়। আর আছে দিগন্ত জোড়া আলুর ফার্ম। গাড়ি আর বাইক তার দ্বিতীয় প্রেম। আর রোজানের ভাষ্যমতে রিক দারুন বিক্রেতা। রোজান ছাড়া আর সবকিছুই নাকি সে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়ে আবার সস্তায় কেনে। রিকের ভাষায়, এভরিথিঙ ইজ সেলেবল। যাই হোক, গত এক বছর রিক হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটেছে এই দেড় বছরের ট্রিপের টাকা জোগাড় করতে। তাই সে একটা দিনও নষ্ট করতে চায় না।

সিলেটে গিয়ে চা পাতা খাচ্ছে রোজান

সিলেটে গিয়ে চা পাতা খাচ্ছে রোজান

দিয়া তাদের বুঝিয়ে বলল, আমরা আসলে এই দেয়ালে কী করতে চেয়েছিলাম। প্রজেক্টর দিয়ে মানচিত্রের ছবি দেয়ালে ফেলে সেটাকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে ফেলাটাই আমাদের সরল উদ্দেশ্য। তারপর যেসব দেশে আমরা ইতিমধ্যেই ভ্রমণ করছি সেগুলোকে মার্ক করে রাখতে চাই। রঙ-টঙ কিনে হুলুস্থুল অবস্থা। দিয়ার নেতৃত্বে এর পরের কয়েক ঘন্টার পরিশ্রমে দাড়িয়ে গেল এই মহান কর্ম। আমাকে আর কিছু জানানো হয় নি। মধ্য রাতে বাসায় ফিরে আমি সারপ্রাইজড।

Rik Rossane 1.jpg din

আমাদের চায়না ট্রিপ থেকে আনা টুকরো ডায়নোসর জোড়া লাগাচ্ছি। এটা করতে আমাদের ৩ ঘন্টা সময় লেগেছিল।

হরতাল তাইলে সবসময় খারাপ না। হরতাল থেকে যদি এমন শিল্পকর্ম হয় তাহলে তো হরতালই ভালো। কি বলেন?

Advertisements