যে যাত্রার গন্তব্য নেই

ভাবনাটা এসেছিল বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনি রিহলা পড়তে গিয়ে। অবাক করা কাণ্ডই বটে! বতুতা সাহেব মাত্র ২০ বছর বয়সে পৃথিবী দেখতে বেরিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তাঁর ৪৯ বছর বয়সে। অর্থাৎ পৃথিবীর পথে পথেই কেটেছে তাঁর ২৯ বছর। সেটা সেই ১৪ শতকের ঘটনা। জলদস্যু, মরুভূমির ঝড় আর পাগলা রাজাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে বতুতা কখনো হেঁটে, কখনো জাহাজে চড়ে তাঁর বিশ্বভ্রমণ করেছেন। আর এখনকার এই দারুণ প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার যুগে আমরা তিন দিন চার রাত ধরনের প্যাকেজ টুর ছাড়া কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে জটিল অঙ্ক শেষ করে এক মাস আগে থেকে ঠিক করি কোথায় যাব, কীভাবে যাব, কত দিন থাকব, কোথায় থাকব ইত্যাদি। এরইমাঝে সবকিছুকে উড়িয়ে দিয়ে ‘বতুতাদর্শে’ উদ্বুদ্ধ হয়ে গত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের এক সুন্দর সকালে আমি ও দিয়া বেরিয়ে পড়েছিলাম দেশের উত্তরাঞ্চলের দিকে। কোনো দর্শনীয় জায়গা দেখার ইচ্ছে নিয়ে নয়, ইচ্ছেটা ছিল যেখানে রাত হবে, সেখানেই কাত হব; যেতে যেতে যে রাস্তা ভালো লাগবে, সেদিকেই চলতে শুরু করব। একেবারে যেদিকে দুচোখ যায় টাইপ অবস্থা। সম্বল পকেটের কিছু টাকা আর ছোট্ট ৮০০ সিসির সুজুকি মারুতি গাড়ি। সেই গাড়ির পেছনের সিটে ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড়, ফার্স্ট এইড কিট, দড়ি, পানি, টিনের কৌটায় বিস্কুট, গল্পের বই, দোতারা, ঢোল ইত্যাদি।
botuta book৪ জুলাই শুক্রবার। ঢাকা থেকে আমিনবাজার হয়ে প্রায় ২০-২৫ বার নানান জায়গায় থেমে যখন আমরা বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পৌঁছাই, তখন আকাশজুড়ে মেঘ। ঠান্ডা বাতাস, কিন্তু বৃষ্টি নেই। ওপর থেকেই দেখছিলাম সেতুর শেষে িনচ দিয়ে একটা সবুজ গাছে ঢাকা রাস্তা কোথায় জানি চলে গিয়েছে। বামে মোড় নিয়ে দেখি সে অপূর্ব সবুজ রাস্তাটি দিয়ে একেবারে সেতুর নিচে যাওয়া যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে সেতুর ওপর ট্রেনের ঝমঝম চলে যাওয়া দেখি। বঙ্গবন্ধু ইকোপার্কে ঢুকে শুনি প্রমত্তা যমুনার বাঁধানো পাড় ঘেঁষে বিস্তৃত সবুজ উলু বনে উন্মত্ত বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ।
তখন বিশ্বকাপের মৌসুম, দুই পাশজুড়ে সবুজ ধানখেত, একটু পরপর চায়ের দোকানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল–জার্মানির পতাকা। রাস্তার ধারের এ গ্রাম ও গ্রাম করে রাত আটটার দিকে আমরা যখন গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর এক ছোট্ট বাজারে পৌঁছাই, তখন আকাশভেঙে নেমেছে বৃষ্টি। চায়ের দোকানে রাত যত বাড়ে, মানুষ তত বাড়ে। দোকানের টিভিতে সবাই মিলে একসঙ্গে খেলা দেখেন, মুড়ির সঙ্গে মেসি-নেইমারদের পারফরমেন্স চিবিয়ে খান। পলাশবাড়ী থেকে সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গার পথে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে। গায়ে জার্সি, সবাই কোনো না কোনো এক বাজারের দিকে যাচ্ছে। রাত ১০টা বাজতেই দেখলাম এক নির্জন গ্রামের পিচঢালা রাস্তায় শামিয়ানা টাঙিয়ে বিশাল প্রজেক্টরে দেখানে হচ্ছে খেলা। গাড়ি থামিয়ে আমরাও বসে পড়লাম খেলা দেখতে।
সেখানেই রাতটা কাটিয়ে দেবী চৌধুরানীর হাট, পীরগাছা, রংপুর হয়ে চলে গেলাম জলঢাকা। তিস্তা ব্যারাজকে একটা দর্শন দিয়ে ডিমলা। তারপর ডোমার, দেবীগঞ্জ হয়ে এই মেঘ, রোদ্র-ছায়া নিয়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মহানন্দা নদীর পারের এক ডাকবাংলোয় ঘাঁটি গাড়লাম যাত্রার পঞ্চম দিনে। এপার–ওপারের সীমানা বরাবর ভারতের কাঁটাতার আর সেখানে ঝুম বৃষ্টির রাত্রিবেলা জ্বলে ওঠে সারি সারি নিয়ন আলো।
বাংলাবান্ধার জিরো পয়েন্টের পাথর সাম্রাজ্য পেরিয়ে একটু ডানে ঢুকলেই চোখে পড়ল আনন্দ গ্রাম। কাজী টি এস্টেটের সবুজ চা-বাগান। রাস্তায় এক নারীকে গরুর দুধ দোয়াতে দেখে শখ জাগল খাঁটি দুধ খাওয়ার। সেখান থেকে পঞ্চগড়ের ধাক্কামারা ইউনিয়নে একটা রাত কাটিয়ে পরের তিনটা রাত কাটালাম ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর-জয়পুরহাট-নওগাঁর বিভিন্ন জায়গায়। এরপর রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ সীমান্ত। চাঁপাইয়ের আমবাগানে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আম ব্যবসায়ীর সঙ্গে আম নিয়ে গল্প আর বিশাল বিশাল ফজলি আম পেলাম ‘ফ্রি’। তারপর আবার নাটোর। সেখানে বনলতা সেনকে খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়ি বনলতা ফিলিং স্টেশনে। চলনবিলের পাড়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ। এরপর আবার যমুনা সেতু হয়ে গাজীপুর দিয়ে কিশোরগঞ্জে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত বাজে তিনটা। সেখানে এক রাত কাটিয়ে আবার ঢাকা।
আমাদের এ যাত্রার মেয়াদ ছিল ১৪ দিন। পাড়ি দিয়েছি সাড়ে ১৮০০ কিলোমিটার রাস্তা। কয়েক রাত কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে ঘুমিয়েছি গাড়িতে, দেখেছি ঘোর বর্ষায় সবুজ উত্তরবঙ্গের রূপ, অসাধারণ মসৃণ রাস্তাঘাট। গরমে লাফ দিয়েছি কোনো স্রোতস্বিনী নদীর ধারায়, কাঁঠাল খেয়ে আঠা ছাড়ানোর তেল খুঁজেছি বাড়ি বাড়ি। ইচ্ছে হলেই হাত-পা ছাড়িয়ে কোনো এক স্কুলে ঢুকে বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে কাটিয়েছি পুরো বেলা। ছিল না কোথাও যাওয়ার তাড়া। দেখা হয়েছে শত শত হাসিমুখের সঙ্গে। মনে হয়েছে ঘড়িতে থেমে যাওয়া এ জীবন সত্যিই অনেক আনন্দের।
এ ছিল এক অদ্ভুত আনন্দযাত্রা। যে যাত্রায় আমরাই একমাত্র পর্যটক, যাদের ছিল না কোনো গন্তব্য। কিছু যাত্রার গন্তব্য থাকতে নেই।

Advertisements