উত্তর বঙ্গ ট্রিপ দেওয়ার আগে দেওয়া ফেসবুকের স্ট্যাটাস

Intercity_Train_Tista_Express_(Bangladesh)২০১৪ সালের জুলাই মাসে আমাদের বিখ্যাত উত্তরবঙ্গ ট্রিপ শুরু করার আগের দিন আমি ফেসবুকে একটা নাতিদীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। সেই স্ট্যাটাস পড়ে একেকজনের একেক রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষেপেছিলেন ডা. ম্যাডাম। উনার ধারণা ছিল ছোট্ট গাড়িটা এই ট্রিপে বাতাসেই উড়ে যাবে। আর আমরা মরে যাবো। তবে তা যে ঘটেনি তা তো বলাই বাহুল্য। কারণ, ভ্রমন কাহিনীর লেখকরা সাধারণত মরেন না।  [স্ট্যাটাসের কমেন্টে পেয়েছিলাম আমরা সবার শুভকামনা। লাইক দিয়েছিল ৫২৬ জন। কমেন্ট দিয়েছিল ৫৯ জন।]

“ছোটবেলায় আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের স্মৃতি নানাবাড়ি যাওয়া। তখনো আন্তনগর ট্রেন চালু হয়নি। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি সরারচর ট্রেন স্টেশন থেকে আমি আব্বা আর আম্মা (ছোট বোন তখনো জন্মায়নি) বিকাল বেলা সেভেন আপ বা এইট ডাউন ট্রেনে উঠতাম। সেই ট্রেন প্রতিটা স্টেশন থেমে থেমে রাত ১২টা/১টার দিকে বাহাদুরাবাদ ঘাটে গিয়ে পৌছাতো।

আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে নিয়ে আব্বা আম্মা দৌড়াতো স্টিমারে ওঠার জন্য। কখনো কখনো স্টিমার ঘাটে থাকতো না। সবাই মিলে তখন ঘাটের হোটেলগুলোয় রাতের খাবার খেতে বসতাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল সেদ্ধ ডিমের তরকারি। সেই স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। এখনো মনে হয় যমুনা নদীর তীরের সেই হোটেলগুলোর চাইতে মজার ডিমের তরকারি কেউ রাধতে পারে না।

৩/৪ ঘন্টার স্টিমার ভ্রমণের পর দূরে দেখা যেত হলুদ লাইট বাল্ববের আলোকমালা। সেটা দেখেই বুঝতাম ওই সাইডের ঘাট চলে এসেছে। ঘাটে গিয়ে স্টিমার ঠিকমতো থামার আগেই লাল জামা পরা কুলিরা লাফিয়ে স্টিমারে উঠে পড়তো। আমরা কুলি ঘাড়ে ব্যাগ বোচকা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে ট্রেনে ওঠে সিট দখলের যুদ্ধে নামতাম। কখনো কখনো ৫-১০টাকা সিট কিনতেও হতো। তারপর সারাদিন জার্নির শেষে বিকাল বেলা সেই ট্রেন গিয়ে থামতো নানাবাড়ির বামনডাঙ্গা স্টেশনে। পুরো একটা দিনই লেগে যেত যেতে।

তারপরের দিনগুলো মামা-খালাদের সাথে দৌড়ে, ঘুড়ি বানিয়ে, নদীতে সারাদিন ঝাপাঝাপি করে, ফুটবল খেলে কীভাবে যে কেটে যেত। মুড়ি আমার খুব প্রিয় ছিল। আমার নানী আমাদের আসার আগেই দুই তিন বস্তা মুড়ি ভেজে রাখতেন। দুধপিঠা, বকুনি পিঠা আরও কত মজার মজার পিঠা যে তিনি বানাতেন। এই বকুনি পিঠা জিনিসটা এখন আর কোথাও দেখি না। আর আক্ষরিক অর্থেই নানি আমাকে রাতের বেলা ‘কিস্তা’ শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। কখনো কখনো আমার ঘুমানোর আগেই তিন গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়তেন। নানা ছিলেন বইয়ের পোকা। সারাদিন-রাত বই পড়তেন। আমার জন্য নবারুন, শিশু পত্রিকা বোঝাই থাকতো। নানা আর আমি দুজন মিলে পত্রিকার পাতায় শব্দজব্দ মিলাতাম। খুব মনে আছে, একবার পত্রিকার পাতায় শব্দ এলোমেলো করে দেওয়ার একটা কুইজ ছাপানো হয়েছিল। নানা কিছুতেই একটা মিলাতে পারছিলেন না। এলামেলো করে দেওয়া সেই শব্দটা ছিল ‘ছুকবানাবর’। আমি কিছুক্ষণ ওটার দিয়ে তাকিয়ে বলে দিয়েছিলাম, এটা হলো ‘বকনাবাছুর’। নানা এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে সাথে সাথে আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে স্টেশানের জুম্মনের দোকানে নিয়ে গিয়ে পেট ভরে দুধ কেক (অসাধারণ এক খাবার ছিল। কেকের ওপর চিনি দিয়ে সেটার উপর গরুর দুধ ঢেলে দিয়ে সেটাকে চামচ দিয়ে কেটে কেটে খেতে হতো।) খাইয়েছিলেন। বছরে এক বা দুইবার গিয়ে মোটামুটি একমাস থাকা হতো নানাবাড়ি।

কি যে আনন্দের দিন। কী যে অ্যাডভেঞ্চারের দিন। উত্তাল ঘাঘট নদীতে পড়ে যাওয়া, মামাদের প্ররোচনায় লাল কাচামরিচ খেয়ে মরতে বসা, ট্রেনের নীচে কাটা পড়া মানুষ দেখতে কতদূরে চলে যাওয়া।

তারপর কতকিছু হয়ে গেছে। আন্ত নগর ট্রেনের যুগ এসে গেল। তারও পরে আবার যমুনা সেতু হলো। এখন তো বাহাদুরাবাদ-জগন্নথগঞ্জ ঘাটই মনে হয় বন্ধ হয়ে গেছে। সেতু দিয়ে ঢাকা থেকে ট্রেনে উঠে এক বসায় নানাবাড়ি চলে যাওয়া যায় এখন।

কিন্তু নানা বাড়ি যাওয়ার আনন্দ এখনো কমেনি। কিন্তু এর ভেতর দীর্ঘদিন নানাবাড়ি যাইনি। নানা-নানী প্রায়ই ঢাকায় মামার বাসায় আসে। নানার বই পড়ার স্বভাব আগের থেকে বেড়েছে। আমি নানাকে দেখতে যাই একটা বই বা কিশোর আলো হাতে নিয়ে। দারুণ খুশি হন তিনি। নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। এবারের মুহম্মদ জাফর ইকবালের টুনটুনি ও ছোটাচ্চুটা একটু ম্যাড়মেড়ে হয়েছে। এই লেখাটা না ছাপলেই পারতে, তোমার লেখাটা এই জায়গায় সমস্যা আছে। কতকিছু। নানানানীর সাথে নিয়মিত দেখা হয় বলেই হয়তবা দীর্ঘদিন নানাবাড়ি যাই না। তাই যখন গত কয়েকদিন হয় যখন পরিকল্পনা করছিলাম নানাবাড়ি যাবো, ভাবতেই অনেক অনেক স্মৃতি মাথার ভেতর খেলা করছে। অনেক খুশি খুশি লাগছে। সত্যি অনেক অনেক খুশি লাগছে।

কালকে শুক্রবার ভোরে আমি আর দিয়া মিলে রওনা হচ্ছি নানাবাড়ির দিকে। ১০-১৫ দিনের ট্রিপ। শরীরে কুলালে তারও বেশি দিনই হয়তোবা থাকবো। নানাবাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা হয়ে ইচ্ছে আছে পীরগাছা, কুড়িগ্রাম, চিলমারি, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ডোমার, সৈয়দপুর হয়ে দিয়ার নানাবাড়ি রাজশাহী যাওয়ার। বা অন্য কোথাও চলে যাওয়ার।

এটি হতে যাচ্ছে একটি সরল উত্তরবঙ্গ ট্রিপ। কোনো তাড়া নাই আমাদের। অমুক জায়গায় যেতেই হবে এমন কোনো লক্ষ্যও বেধে দেয়নি কেউ আমাদের। যেখানে রাইত হবে সেখানেই কাইত হয়ে যাবো। খাবো দাবো নদীতে গোসল করবো, গরমে ঘামবো, যমুনার পাড়ে বসে হেরে গলায় গাইবো ♫ Take me away, a secret place, A sweet escape, take me away, to better days, Take me away, a hiding place ♫

তাই খুব জরুরি প্রয়োজনেও যদি আমি আর দিয়া আপনার ফোন না ধরি, ইমেইলের রিপ্লাই না দেই, ইনবক্সে সিন না উঠে তাহলে প্লিজ মাইন্ড করবেন না। তবে আমাদের এ যাত্রপথে কেউ যদি দাওয়াত দিতে চান, রাস্তার ধারে আম, জাম, লিচু নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে চান তবে আমরো মাইন্ড করবো না।

আর আপনার বাড়ি যদি উত্তরবঙ্গে হয় আর এর ভেতর কোন একদিন যদি দেখেন ছোট্ট একটা লাল গাড়ি ধীরে ধীরে কোথায় জানি যাচ্ছে তবে আমাদের উদ্দেশে আপনি একটু হাত নেড়ে দিয়েন। আমরাও আপনাকে হাত নেড়ে দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো নিশ্চিত।

ভালো থাকবেন সবাই। ঢাকা শহরকে আমাদের অনুপস্থিতিতে একটু দেখে শুনে রাইখেন। সবার জীবন আনন্দের হোক। ওম শান্তি।”

Advertisements