উত্তর দি বঙ্গ ট্রিপ

সারাজীবন শুনে এnorthসেছি, যার যত প্ল্যানিং ভাল, সে তত লাভবান হবে। বিশেষকরে কোথাও বেড়াতে গেলে তো প্ল্যানিং ছাড়া কোন কিছু কল্পনা করা যায় না। কোথায় থাকব, কীভাবে যাব, কয়দিন থাকব, কী কী দেখব, বাজেট কত এসব অন্তত এক মাস আগের থেকে ঠিক করে না রাখলে ভ্রমণ দূর্বিষহ হয়ে উঠবে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো ঘটনা ঘটলো। রবীন্দ্রনাথের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা “দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু, দেখা হয় চোখ মেলিয়া, ঘর হইতে দুপা ফেলিয়া, একটি ঘাসের শিশিরের ওপর আর এক, শিশির বিন্দু।” শর্ত একটিই – কোন ধরনের প্ল্যানিং-এর ঝামেলায় যাওয়া যাবে না। যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে যাব, যতদিন ইচ্ছে, ততদিন থাকব।

আমাদের দুজনেরই নানাবাড়ি উত্তরবঙ্গে। ছেলেবেলায় সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলো কেটেছে আম কুড়িয়ে, ট্রেন স্টেশনে দুধের কেক খেয়ে আর নানার লাইব্রেরিতে বই পড়ে। নাড়ির টানে এবারের উদ্দেশ্যহীন সফর তাই শুরু করলাম উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে। ঢাকা থেকে যমুনা সেতু পার করে সোজা গাইবান্ধায় একজনের নানাবাড়িতে যাব, সেখান থেকে রংপুর, তেতুলিয়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট হয়ে আরেকজনের নানাবাড়ি রাজশাহীতে আসব। তারপর বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা ফিরব। এর মাঝে যদি কোথাও খুব ভাল লাগে বা অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছে করে, চোখ বন্ধ করে চলে যাব। নানাবাড়ি ছাড়া আর কোথায় কীভাবে থাকব, তা নিয়ে কোন প্ল্যানিং করা ছিল না। মানুষ মানুষের জন্য – এই নীতি হৃদয়ে ধারন করে আমরা আমাদের ছোট্ট লাল গাড়িতে চড়ে বসলাম। গাড়ির পেছনে আমাদের কাপড়চোপড়ের পাশাপাশি কাপড় শুকানোর জন্য দড়ি, টিনের কৌটায় বিস্কুট, ঘুমানোর জন্য চাদর, কাঁচি, গল্পের বই, ফার্স্ট এইড কিট সবই আছে। কোন ভয় নেই।

শুক্রবার সকালে সাধারণত রাস্তায় যানজট কম থাকে, তাই এক টানে সাভার আমিনবাজারে পৌছালাম। বাস, ট্রাক, দালানকোঠার মাথা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায় ছয়লাব। চায়ের দোকানে উত্তপ্ত আলোচনা, কে জীতবে বিশ্বকাপ। নাস্তায় পরাটার পাশাপাশি মেসি-নেইমারকেও চিবিয়ে খেয়ে রওনা হলাম যমুনা সেতুর উদ্দেশ্যে। দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে দুই-একটা দূরপাল্লার বাস আর মাখনের মত মসৃণ রাস্তা। কোন “পিইপ! পিইপ!” ছাড়া আমাদের ৮০০ সিসির ‘ফেরারী’ চলতে থাকল। যমুনা সেতুর বিশালতা আমাদের দু’জনকে প্রতিবারই অবাক করে। পানির উপর চর এলাকা তখন সবুজ, দূরে তাকালে গাছের ফাঁকে ছোট্ট টিনের ঘর দেখা যায়। এবারের সফরে অবশ্য আরো অবাকের ছিল সেতুর পাশ দিয়ে নিচে নেমে যাওয়া রাস্তা। সেতু পার হয়ে বাম দিকে গেলে এই রাস্তা ধরে সেতুর নিচে যাওয়া যায়। তবে এখানে পুলিশ ২৪ ঘণ্টা টহল দেয়। কোস্টগার্ড ও সেতু নির্মানকারীরা ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। আমরা বেশিদূর যেতে পারিনি। দূর থেকে দেখলাম সেতুর নিচ দিয়ে উপরের ট্রেন চলাচল দেখা যাচ্ছে। যমুনা সেতুকে এই জায়গা থেকে কখনোই দেখা হয়নি, তাই তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা সংরক্ষিত এলাকার এপাশে দাঁড়িয়ে আমরা হা করে ট্রেন দেখলাম কিছুক্ষণ। আশেপাশে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যমুনা সেতুর ডান দিয়ে বঙ্গবন্ধু ইকো পার্ক। সেখান থেকেও নাকি সেতু দেখা যায়। সাথে সাথে আমরা গাড়িতে চেপে এক টানে ইকো পার্কে ঢুকলাম। বিস্ময়ভরা চোখে দেখলাম ইকো পার্কে সত্যি সত্যি বানর, সজারু রয়েছে। পার্কের শেষ মাথায় বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সবুজের ছড়াছড়ি, অপরদিকে তাকালে পুরো যমুনা সেতু দেখা যায়। দারুণ এই জায়গাটি পেয়ে আমরা দু’জনই বাকি সফরের কথা ভুলে সবুজ ঘাস, বুনোফুল আর গাছের ছায়ায় ছোটাছোটি শুরু করলাম। ঘড়ির কাটা চলতে থাকল।

পার্ক থেকে যখন বের হলাম, তখন খিদেয় পেট চো চো করছে। হাইওয়েতে যেসব হোটেলে বাস থামে, সেরকম একটা হোটেলে থেমে লাঞ্চ সেরে নিলাম। এরপর আবার যাত্রা শুরু। সদ্য ফিট করা গাড়ির মিউজিক প্লেয়ারে একের পর এক গান বাজছে, দুপাশে আবারও অন্তহীন সবুজ আর আমাদের টুকটাক গল্প। সন্ধ্যার ভেতরে আমরা পলাশবাড়িতে এসে পৌছালাম। গাড়ি বেশ গরম হয়ে গিয়েছে, ওদিকে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছে। যাত্রায় ছোট্ট বিরতি না দিয়ে উপায় নেই। চাইয়ের দোকানে ঢুকে দেখি লোকজন গমগম করছে। টিভিতে সাকিব খানের সিনেমা দেখার ফাঁকে সেদিন রাতের জার্মানি বনাম ফ্রান্স খেলায় কে জীতবে, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। মজার বিষয় হল, সন্ধ্যার পর গ্রামবাজারের চায়ের দোকানগুলো মুখরিত হতে থাকে। যত রাত ঘনিয়ে আসে, তত লোকসংখ্যা বাড়ে। উচ্ছাস-উদ্দীপনা নিয়ে তরুণ ছেলেমেয়েরা নেইমার-মেসির জার্সি গায়ে দোকানে আসে, চায়ের ফাঁকে পলের মত ভবিষ্যতদ্বানী করে। শহরের তুলনায় গ্রামে বিশ্বকাপ উন্মাদনা অনেক বেশি, এমন কোন দেয়াল পাওয়া যায়না যেখানে প্রিয় দলের খেলোয়ার-পতাকা আঁকা নেই। পলাশবাড়ি পেরিয়ে আমরা যখন বামনডাঙ্গার দিকে রওনা দিলাম, হতভম্ভ হয়ে দেখলাম রাস্তার দু’পাশ দিয়ে মানুষ আর মানুষ। সবাই আশেপাশের বাজারে যাচ্ছে, সবাই মিলে একসাথে খেলা দেখবে। সে আরেক উৎসব!

কিন্তু একি! নানাবাড়ি পৌছে আমরা তাজ্জব বনে গেলাম। বাড়ির কাছে ভ্যারাইটিজ দোকানের সামনে পুকুরপারে বিশাল পর্দা টাঙ্গানো। প্রজেক্টারের সাথে লাইন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, দারুণ আওয়াজ দিয়ে খেলা চলছে। পাড়ার সবাই দোকানের সামনে রাস্তায় বসে খেলা দেখছে, আশেপাশের বাড়ি থেকে পাঠানো মুড়ি-মিঠাই খাওয়া হচ্ছে। শহরে এরকম প্রজেক্টর লাগিয়ে খেলা দেখতে চাইলে একশো একটা ঝামেলার কথা শুনিয়ে দেওয়া হয়, এদিকে বামনডাঙ্গার এই অজপাড়াগাঁইয়ে কী সুন্দর করে সবাই মিলে খেলা দেখছে! গাড়ি সেখানে থামিয়ে আমরাও খেলা দেখতে বসে গেলাম। এর ফাঁকে খালারা এসে রাতের খাবার দিয়ে গেলেন। ওহ, হোম সুইট হোম!

পরদিন সকালে বামনডাঙ্গা ট্রেন স্টেশনে গেলাম। ছেলেবেলার প্রচুর স্মৃতি এই ট্রেন স্টেশন ঘিরে। স্টেশনের পাশে মোহনা পাঠাগারে অনেকের বই পড়ার হাতেখড়ি হয়েছে। বামনডাঙ্গা পেরিয়ে পীরগাছা হয়ে আমরা দুপুরের দিকে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সেদিন রাতে রংপুর থামলাম আর্জেন্টিনার টান টান উত্তেজনার খেলা দেখবার জন্য। পরদিন ভোরে আমরা

রংপুর যাবার পথে থামলাম ভিন্নজগতের সামনে। ভিন্নজগৎ খোলা চোখে দেখলে মনে হবে ঢাকার শিশু পার্ক বা ফ্যান্টাসি কিংডমের মত। তবে আমরা যখন ঘুরে বেরাচ্ছি, তখন অফ সিজন অর্থাৎ লোকজন বলতে গেলে নেই। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় আফ্রিকার কোন জঙ্গলে এসে পড়েছি, গাছের ফাঁকে জিরাফের মাথা বা হরিণের পাল দেখা যায়।

 

Advertisements